নবম পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে, যেকোনো সময় ঘোষণা—সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যেকোনো সময় নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। রোববার (১৬ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
মুখ্য সচিবের এই বক্তব্যে নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের দাবি থাকলেও নানা প্রক্রিয়াগত ও অর্থনৈতিক কারণে বিষয়টি ঝুলে ছিল। এবার সচিব কমিটির পর্যায় থেকে প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার কথা জানানোয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপে পৌঁছেছে।
চলতি অর্থবছরেই বাস্তবায়নের কথা
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব জানিয়েছেন, সরকারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় চলতি অর্থবছরেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। তবে ঠিক কোন তারিখ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
এর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন—নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার তারিখ কী হবে, নতুন মূল বেতন কত হবে এবং পূর্ববর্তী সময়ের জন্য কোনো বকেয়া বা আর্থিক সমন্বয় কীভাবে করা হবে। এসব বিষয় চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন বা অনুমোদিত কাঠামো প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সচিব কমিটির প্রস্তাব নীতিগতভাবে চূড়ান্ত
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পর এটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রক্রিয়াটি মূলত চূড়ান্ত অনুমোদন ও ঘোষণার পর্যায়ে রয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কারণ পে-স্কেল নিয়ে কমিশনের সুপারিশ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত বিবেচনার পর সচিব কমিটির সুপারিশই পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
বেতন কত বাড়তে পারে?
নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো এখনো প্রকাশিত না হলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে সচিব কমিটির প্রস্তাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে। সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ থাকার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন না বাড়িয়ে তুলনামূলকভাবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বেশি হারে বাড়ানোর বিষয়ে মত দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম পে কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশের কথা প্রকাশিত হয়েছে। তবে কমিশনের সুপারিশ এবং সচিব কমিটির চূড়ান্ত প্রস্তাব এক বিষয় নয়; মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পরই কার্যকর বেতন কাঠামো নিশ্চিত হবে।
১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল
ছবিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণত পাঁচ বছর পরপর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল দেওয়ার প্রচলন থাকলেও আগের সরকার দীর্ঘ সময়েও নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করেনি। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবও বলেছেন, গত সরকার ১১ বছরেও পে-স্কেল বাস্তবায়ন করেনি।
বাংলাদেশে সর্বশেষ অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ২০১৫ সালে কার্যকর হয়েছিল। এরপর সরকারি কর্মচারীরা নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেলেও নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো আর কার্যকর হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নতুন পে-স্কেলের দাবি আরও জোরালো হয়।
প্রায় ১৮ লাখ কর্মচারীর ওপর প্রভাব
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রভাব সরাসরি পড়বে বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মচারী নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
বেতন বাড়লে শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়বে না; এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও পড়তে পারে। সরকারি কর্মচারীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে ভোগব্যয় বাড়তে পারে, বাজারে চাহিদা তৈরি হতে পারে এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসতে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারের নিয়মিত ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
অর্থনীতিতে চাপের কথাও স্বীকার
পে-স্কেল বাস্তবায়নের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এর ফলে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে অর্থনীতিতে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং পে-স্কেল বাস্তবায়ন সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে। তবে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানেই নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
এখন নজর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে
বর্তমান পরিস্থিতিতে নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী ধাপ হলো মন্ত্রিসভার অনুমোদন। সচিব কমিটির প্রস্তাব চূড়ান্ত হলেও সেটিই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো নয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং পরবর্তী সরকারি আদেশ/প্রজ্ঞাপনে বেতনহার, গ্রেড কাঠামো, কার্যকর তারিখ, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিস্তারিত স্পষ্ট হবে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বেতনহার বা কার্যকর তারিখকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে সরকারি প্রজ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করাই নিরাপদ।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা এখন একটাই
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেলের সম্ভাবনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধির আশা করছেন।
অন্যদিকে, সরকার যদি চলতি অর্থবছরেই পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেয়, তাহলে এটি সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের একটি বড় দাবির সমাধান হিসেবে বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে, নবম পে-স্কেল এখন আর শুধু আলোচনার পর্যায়ে নেই—সচিব কমিটির প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়ে তা অনুমোদন ও ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন বেতন কাঠামো কবে এবং কীভাবে কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই সবার নজর।


