৯ম পে-স্কেলের ‘ধাপে ধাপে’ বাস্তবায়নের প্রস্তাবে সরকারি কর্মচারীদের গভীর উদ্বেগ, এক ধাপে শতভাগ মূল বেতন কার্যকরের দাবি
আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘৯ম জাতীয় পে-স্কেল’ কার্যকরের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। তবে একই সাথে নতুন এই পে-স্কেল তিন ধাপে (তিন বছরে) বাস্তবায়নের সরকারি চিন্তাভাবনা ও গুঞ্জনে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। কর্মচারীদের দাবি— দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে ধাপে ধাপে বেতন বাড়ালে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না; বরং মূল বেতন এক ধাপেই শতভাগ কার্যকর করতে হবে।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আবদুল মালেক এবং লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সদস্য সচিব আশিকুল ইসলাম।
দীর্ঘ ১১ বছরের ক্ষোভ ও বাস্তব চিত্র
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেলের পর দীর্ঘ ১১ বছর অতিবাহিত হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেল থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। ফলে অধিকাংশ কর্মচারীর বেতনের মৌলিক কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন হয়নি, যা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে তাদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিম্নগ্রেডের কর্মচারীরা একপ্রকার মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া ২০২০ সাল থেকে নতুন পে-স্কেল না হওয়ায় হাজার হাজার কর্মচারী বেতনের সর্বোচ্চ ধাপে (Maximum Ceiling) পৌঁছে গেছেন, যার ফলে তারা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ব্লক পোস্ট ও পদোন্নতি বঞ্চিতদের গ্রেড পরিবর্তনের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
অতীতের পে-স্কেল বাস্তবায়নের ইতিহাস
কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের ইতিহাসে পূর্ববর্তী পে-স্কেলগুলোর বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, অতীতে কোনো পে-স্কেলই মূল বেতন বাস্তবায়নে দুই ধাপের বেশি সময় নেয়নি:
২০০৫ সালের পে-স্কেল: বিএনপি সরকারের আমলে তিন ধাপে দেড় বছরে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলেও প্রথম ধাপেই (১ জানুয়ারি ২০০৫) মূল বেতনের (বেসিক) ৭৫% কার্যকর করা হয়েছিল।
২০০৯ সালের পে-স্কেল: দুই ধাপে বাস্তবায়িত হয়, যার প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করা হয়েছিল এবং পরের ধাপে ভাতাগুলো দেওয়া হয়।
২০১৫ সালের পে-স্কেল: অষ্টম পে-স্কেলটি এক ধাপেই শতভাগ কার্যকর করা হয়েছিল (কেবল গেজেট বিলম্বে হওয়ায় বকেয়া অর্থ ধাপে দেওয়া হয়)।
তিন ধাপে বাস্তবায়নে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক জটিলতার শঙ্কা
নেতৃবৃন্দ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যাচ্ছে— এবারের ২০২৬ সালের ৯ম পে-স্কেলটি তিন ধাপে তিন বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে প্রথম ধাপে মূল বেতনের মাত্র ৫০ শতাংশ দেওয়ার আলোচনা চলছে।
সংগঠনের মতে, পে-স্কেল ঘোষণার সাথে সাথেই বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার একটি অসাধু প্রবণতা রয়েছে। এই অবস্থায় মাত্র ৫০% বেতন বৃদ্ধি কর্মচারীদের কোনো আর্থিক স্বস্তি দেবে না। উল্টো দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার দ্রব্যমূল্য বাড়াবে। এছাড়া বেসিক ভেঙে কার্যকর করলে আইবাস (iBAS++) ব্যবস্থাপনা ও পিআরএলভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে তীব্র প্রশাসনিক ও আর্থিক জটিলতা তৈরি হবে।
কল্যাণ সমিতির মূল দাবিসমূহ:
১. এক ধাপে মূল বেতন: রাষ্ট্রের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে ভাতাসমূহ ধাপে ধাপে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে ৯ম পে-স্কেলের সকল গ্রেডের শতভাগ মূল বেতন একই ধাপে একবারে কার্যকর করতে হবে।
২. বিশেষ সুবিধা বহাল: পূর্ণাঙ্গ মূল বেতন বাস্তবায়নের পূর্বে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার করা যাবে না।
৩. টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড: ২০১৫ সালে রহিত হওয়া ৩টি টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনরায় চালু করতে হবে, যাতে ব্লকপদ ও পদোন্নতি বঞ্চিতরা ১০ বছর পর গ্রেড পরিবর্তনের সুযোগ পান।
৪. পেনশন ও গ্রাচুইটি: শতভাগ পেনশন উত্তোলনের সুবিধা পুনর্বহাল এবং পেনশন গ্রাচুইটি ২৩০ টাকার পরিবর্তে দ্বিগুণ করতে হবে।
৫. ভাতা বৃদ্ধি: বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসা ভাতা, শিক্ষা ভাতা, যাতায়াত ভাতা ও টিফিন ভাতা যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিনীত আবেদন
সংবাদ সম্মেলন থেকে ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিবারের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট বিনীত আবেদন জানিয়ে বলা হয়, একটি স্বনির্ভর, সুশাসনভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সন্তুষ্ট ও কর্মউদ্দীপ্ত জনবলের বিকল্প নেই। দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর করে প্রতিটি সাধারণ কর্মচারীর পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানান নেতৃবৃন্দ।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন কল্যাণ সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক শিমুল আহমেদ, শাহাবুদ্দিন মুন্সী, মো: শাহিন খান; খুলনা জেলার আহ্বায়ক সোহানা মির্জা, চট্টগ্রাম জেলার আহ্বায়ক মেহেদী হাসান; পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো: মুনীরুজ্জামান; অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোঃ জুয়েল হোসেন; বাংলাদেশ কাস্টমসের সভাপতি আবু সালেক খান; বাংলাদেশ সরকারি গাড়িচালক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব হুমায়ুন কবির; বুয়েট টেকনিক্যাল এমপ্লয়িজ এসোসিয়েশনের সভাপতি এ এস এম শাহিন এবং কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যথাক্রমে সোহেল রানা, এবি বেগম, আমেনা বেগম, আজিজুর রহমান, রাসেল শেখ, ওমর ফারুক ও খলিলুর রহমান প্রমুখ।


