চাকুরী (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ ১৯৯৭ : পে স্কেল ৬০% এবং ৪০% হিসেবে দুই বছরে বাস্তবায়ন হয়েছিল?
১৯৯৭ সালের ২১শে অক্টোবর (৬ই কার্তিক, ১৪০৪ বাংলা) তৎকালীন অর্থ সচিব ডঃ আকবর আলি খান স্বাক্ষরিত একটি ঐতিহাসিক অতিরিক্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। ‘এস, আর, ও নং-২৪২-আইন/১৭ইং/অম/অবি (বান্তঃ)-১/জাঃ বেঃ স্কেল-১/১৭/২১৭’ মূলে জারীকৃত এই আদেশটি “চাকুরী (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ১৯৯৭” নামে অভিহিত। ১৯৯১ সালের পূর্ববর্তী স্কেল বিলুপ্ত করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা আনয়নে এই নতুন ২০ স্তরবিশিষ্ট জাতীয় বেতন স্কেল প্রবর্তন করা হয়েছিল, যা মূলত ১৯৯৭ সালের ১লা জুলাই থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়।
ঐতিহাসিক এই গেজেটটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৫ সালের ১০ শতাংশ অন্তর্বর্তীকালীন বেতন বৃদ্ধিসহ তৎকালীন ‘চাকুরী (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ১৯৯১’ সম্পূর্ণ রহিত করে এই নতুন কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছিল। তবে তৎকালীন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন স্কেলের আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি এক দফায় না দিয়ে দুই দফায় প্রদানের এক অভিনব আর্থিক কৌশল অবলম্বন করেছিল তৎকালীন সরকার।
বেতন নির্ধারণ ও আর্থিক সুবিধা বণ্টনের অনন্য কৌশল
গেজেটের ১(৩)(ক) অনুচ্ছেদের বিশেষ বিধান অনুযায়ী, ১লা জুলাই ১৯৯৭ তারিখে নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর যে বর্ধিত অংশ (অর্থাৎ, ১৯৯৭ স্কেলের নির্ধারিত বেতন এবং ১৯৯১ স্কেলের বেতনের পার্থক্য) তৈরি হয়, তার মাত্র ৬০ শতাংশ ৩০শে জুন ১৯৯৭ তারিখে আহরিত বেতনের সাথে যোগ করে প্রথম বছর (১লা জুলাই ১৯৯৭ থেকে ৩০শে জুন ১৯৯৮ পর্যন্ত) প্রদান করা হয়েছিল। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ বর্ধিত অংশ পরবর্তী অর্থবছর অর্থাৎ ১লা জুলাই ১৯৯৮ থেকে কার্যকর করা হয়।
একইভাবে, উৎসব ভাতাসহ অন্যান্য সকল ভাতা ৩০শে জুন ১৯৯৭ তারিখে প্রাপ্ত সমপরিমাণ অংকে ৩০শে জুন ১৯৯৯ পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখা হয়। ১লা জুলাই ১৯৯৯ থেকে টিফিন ভাতা ব্যতীত অন্যান্য সকল ভাতা নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণের আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল। এছাড়া ১লা জুলাই ১৯৯৭ থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ পর্যন্ত প্রথম ৩ মাসের বকেয়া বেতন নগদ না দিয়ে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল, যা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ভাঙানো যেত।
১৯৯১ বনাম ১৯৯৭: বেতন স্কেলের তুলনামূলক চিত্র
তৎকালীন কাঠামোতে সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ১০,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১৫,০০০ টাকায় এবং সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ৯০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১,৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়। মূল ২০টি গ্রেডের তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত চিত্র:
গ্রেড ১: ১০,০০০/- (নির্ধারিত) থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৫,০০০/- (নির্ধারিত) টাকা হয়।
গ্রেড ২: ৮,৬০০-৯,৫০০/- থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১২,৯০০-১৪,৩০০/- টাকা হয়।
গ্রেড ১০: ২,৩০০-৪,৪৮০/- থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩,৪০০-৬,৬২৫/- টাকা হয়।
গ্রেড ২০ (সর্বনিম্ন): ৯00-১,৫৩০/- থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১,৫০০-২,৪০০/- টাকা হয়। (বিস্তারিত ২০টি গ্রেডের তালিকা সংযুক্ত PDF ফাইলের সারণীতে স্পষ্টভাবে সন্নিবেশিত রয়েছে)
টাইম-স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের আইনি রূপরেখা
আদেশে উচ্চতর স্কেল বা ‘টাইম-স্কেল’ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের (১০ থেকে ২০ নম্বর স্কেল) ক্ষেত্রে একই বা সমপর্যায়ের পদে যথাক্রমে ৮, ১২ এবং ১৫ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ হলে ১ম, ২য় ও ৩য় উচ্চতর টাইম-স্কেল প্রদানের নিয়ম করা হয়, তবে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ ৩টির বেশি টাইম-স্কেল না পাওয়ার শর্তারোপ করা হয়। ২য় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২টি এবং ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ ১টি টাইম-স্কেল প্রাপ্তির সুযোগ রাখা হয়, যা সর্বোচ্চ ৪র্থ স্কেল (১০,৭০০-১৩,১০০ টাকা) পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।
বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতার বিশেষ নিয়মাবলি
গেজেটে সরকারি আবাসন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম আরোপ করা হয়। সরকারি আবাসন ভোগকারী ১ থেকে ১২ নম্বর স্কেলের কর্মকর্তাদের মূল বেতনের ৭.৫ শতাংশ এবং ১৩ থেকে ১৭ নম্বর স্কেলের কর্মচারীদের মূল বেতনের ৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া বাবদ কেটে রাখার বিধান করা হয়। তবে ১৮ থেকে ২০ নম্বর স্কেলের কর্মচারীদের জন্য সরকারি বাসায় থাকার ক্ষেত্রে কোনো ভাড়া কর্তন না করার মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যদি স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই কোনো সরকারি বা স্ব-শাসিত সংস্থা, ব্যাংক বা অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানের চাকুরীজীবী হন এবং একত্রে সরকারি বাসস্থানে বসবাস করেন, তবে যার নামে বাসস্থান বরাদ্দ রয়েছে তার বেতন থেকে নির্ধারিত হারে ভাড়া কাটা হবে এবং তিনি কোনো বাড়ি ভাড়া ভাতা পাবেন না। তবে অপরজন ৩০শে জুন ১৯৯৭ তারিখে আহরিত হারে বাড়ি ভাড়া ভাতা প্রাপ্য হবেন।
অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট ও টিফিন ভাতার বিশেষ বিধান
প্রথম নিয়োগের ক্ষেত্রে কারিগরি ও বিশেষ পেশাদারদের উৎসাহিত করতে আদেশে অগ্রিম ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। যেমন—এমবিবিএস, ইঞ্জিনিয়ারিং বা আর্কিটেকচার ডিগ্রিধারীদের জন্য ১টি এবং অতিরিক্ত ফিজিক্যাল প্ল্যানিং ডিগ্রিসহ মাস্টার্সধারীদের জন্য ২টি অগ্রিম ইনক্রিমেন্টের স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। তাছাড়া সহকারী জজ এবং ল-ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও বয়সের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৪টি পর্যন্ত অগ্রিম ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্তির সুযোগ রাখা হয়। বেসামরিক নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য সম্পূর্ণ নতুনভাবে মাসিক ১০০ টাকা হারে ‘টিফিন ভাতা’ চালুর ঘোষণা এই আদেশের অন্যতম আকর্ষণ ছিল।
অবসরভোগী ও প্রেষণে থাকা কর্মকর্তাদের সুরক্ষা
আদেশের ৬(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১লা জুলাই ১৯৯৭ থেকে ৩০শে জুন ১৯৯৮ সালের মধ্যে যারা অবসরে গিয়েছেন, তাদের পেনশন ও আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) নির্ধারণের ক্ষেত্রে ১৯৯৭ সালের নতুন স্কেলের পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল। পিআরএল বা অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও শুধুমাত্র পেনশন হিসাবের স্বার্থে নতুন স্কেলে কাল্পনিক বেতন নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। প্রেষণে (Deputation) কর্মরতদের ক্ষেত্রেও মূল daptarer প্রাপ্যতার ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণের নিয়ম কার্যকর করা হয়, যা সরকারি কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করে।
আইনি ও কর কাঠামোর সরলীকরণ: এই আদেশের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন স্কেলে প্রাপ্য বেতন ও ভাতাদির ওপর প্রযোজ্য আয়কর সরকার কর্তৃক পরিশোধিত বলে গণ্য করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন সরকারি চাকুরেদের বড় ধরনের স্বস্তি প্রদান করেছিল।



