চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষায় পেনশন সুরক্ষিত : নিহত রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর পরিবার পাবে আজীবন পেনশন ও গ্র্যাচুইটি
মাত্র ২ বছর চাকরি করেই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটি পাওয়ার অধিকার তৈরী হয় না—কিন্তু নিহত রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ভিন্ন। মাত্র ৭ মাস আগে যোগদান করলেও বিধি মোতাবেক পূর্বের খাদ্য পরিদর্শকের চাকরির ৭+ বছর তার বর্তমান চাকরিতে যুক্ত হয়ে গেছে, ফলে তার পরিবার এখন আইনগতভাবেই আজীবন পেনশন ও এককালীন গ্র্যাচুইটি সুবিধা পাবে।
মর্মান্তিক মৃত্যু ও চাকরির ধারাবাহিকতা
বুলেট বৈরাগী (৩৫) ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে প্রথমে খাদ্য অধিদপ্তরে খাদ্য পরিদর্শক পদে যোগ দেন এবং পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (কাস্টমস) হিসেবে চাকরি শুরু করেন। সর্বশেষ তিনি কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন।
গত ২৪ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ শেষে কুমিল্লার বাসায় ফেরার পথে এক পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের হামলায় তিনি নিহত হন। ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৬ এপ্রিল টুঙ্গিপাড়ার নিজ গ্রামের বাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
নিয়ম কী বলে?
সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী, স্বাভাবিক নিয়মে চাকরির মেয়াদ ৫ বছরের কম হলে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে পরিবার গ্র্যাচুইটি ও পেনশন পায় না। তবে ব্যতিক্রমী নিয়মটি প্রায় অজানা: যদি কোনো সরকারি কর্মচারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এক রাজস্বখাতের চাকরি থেকে অন্য রাজস্বখাতের চাকরিতে যোগদান করেন, তাহলে পূর্বের চাকরির পুরো মেয়াদ নতুন চাকরিতে গণনা করা হয়।
বুলেট বৈরাগী খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে প্রায় ৭ বছর চাকরি করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর তার মৃত্যু পর্যন্ত এই পদে মাত্র ৭ মাস কেটেছে। কিন্তু সরকারি বিধি অনুযায়ী, তার মোট চাকরিকাল গণনা হয় ৭+ বছর, যা পেনশনের জন্য নির্ধারিত ৫ বছরের শর্ত পূরণ করে।
বেতন প্রটেকশনের সুবিধাও নিশ্চিত
সরকারি বিধি মোতাবেক, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চাকরি পরিবর্তন করলে পূর্বের পদের মূল বেতন ও চাকরিকাল নতুন চাকরিতে যুক্ত হয়। নতুন পদের বেতন পুরনো চাকরির চেয়ে কম হলেও বেতন সংরক্ষণ (পে প্রটেকশন) সুবিধা পাওয়া যায়। জিপিএফও স্থানান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী পেনশন বিধি (২০১৫ সালের প্রজ্ঞাপন) অনুযায়ী, কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে পরিবার মৃতের শেষ আহরিত মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করে ২১% হারে পারিবারিক পেনশন ও নির্ধারিত গ্র্যাচুইটি পাবে। আনুতোষিকের হার ১০ বছর থেকে কমিয়ে ৫ বছর করা হয়েছে এবং প্রতিটি বাধ্যতামূলক সমর্পিত টাকার বিপরীতে ২৩০ টাকা হারে এটি প্রদেয়।
স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার জন্য ২৫ বছর প্রয়োজন; কিন্তু মৃত্যু বা শারীরিক অক্ষমতার ক্ষেত্রে ৫ বছর পূর্ণ হলেই এই সুবিধা প্রযোজ্য।
পরিবারের জন্য স্বস্তি
বুলেট বৈরাগীর পরিবার এখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ এককালীন গ্র্যাচুইটি এবং আজীবন মাসিক পেনশন পাবে। এর ফলে তাদের বেঁচে থাকার জন্য কারোর করুণার পাত্র হতে হবে না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বুলেটের বাবা ছেলেকে পড়ালেখা করাতে ২৭ শতক ধানের জমি এবং মা নিজের গহনা বিক্রি করেছিলেন। অভাবের সংসার থেকে উঠে আসা এই কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যুতে যেমন দেশ শোকাহত, তেমনি তার দূরদর্শী চাকরির পদক্ষেপ নিশ্চিত করেছে যে তার স্বজনরা ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন।
অন্যান্য চাকরিপ্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
বর্তমানে যারা সরকারি চাকরিতে অবস্থান করছেন বা আবেদন করছেন, তাদের জন্য এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। পদোন্নতি বা বদলির সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আবেদন করা এবং চাকরির ধারাবাহিকতা সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত。সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে পূর্বের চাকরির মেয়াদ ও বেতন সংরক্ষণ সম্ভব, যা ভবিষ্যতে পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি চাকরির এই বিধান সম্পর্কে সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে সচেতনতা খুবই কম। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রচারণার মাধ্যমে এই সুবিধা সম্পর্কে কর্মচারীদের জানানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।


