নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের আর্তনাদ : “পরিবার বাঁচাতে ঋণ করি, তবুও বেতন বাড়ে না”— ৯ম পে-স্কেলে ১০০% বেসিক বৃদ্ধির দাবি
দেশের নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ৯ম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে নতুন করে প্রত্যাশা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে অষ্টম পে-স্কেলের বেতনে দায়িত্ব পালন করা এসব কর্মচারীর দাবি, বর্তমান বাজার বাস্তবতায় বিদ্যমান বেতন কাঠামো দিয়ে একটি ছোট পরিবারও সম্মানজনকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তারা ৯ম পে-স্কেলে শতভাগ বেসিক বেতন বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাতা পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
কর্মচারীদের মতে, সমাজে সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে নানা ধরনের নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। বিশেষ করে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের অধিকাংশ কর্মচারী সীমিত বেতনে বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানসহ ৫ থেকে ৬ সদস্যের পরিবার পরিচালনা করেন। অনেকে সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণের আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাদের অভিযোগ, যারা পরিবার ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করেন, তারাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক সংকটে থাকেন; অথচ বেতন বৃদ্ধির আলোচনায় তাদের দুর্ভোগ অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশে দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন দাবি করেছে, এই সময়ে সামষ্টিক মূল্যস্ফীতির হার ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। ফলে বর্তমান বেতন কাঠামো বাস্তব জীবনের ব্যয়ের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এদিকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা ১০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি নির্দেশ করে। একইসঙ্গে বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবের কথাও উঠে এসেছে।
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে দাবি জানিয়েছে যে, ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বৈষম্য রাখা যাবে না। তাদের মতে, উচ্চ ও নিম্ন গ্রেডের মধ্যে বেতনের ব্যবধান কমিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, টিফিন ও অন্যান্য ভাতাও যুগোপযোগী করার দাবি উঠেছে।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টদের মতে, নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই সরাসরি ভোগ ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। ফলে বেতন বৃদ্ধি শুধু কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নে নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আনতে পারে।
বর্তমানে সরকার ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। তবে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রত্যাশা একটাই— দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এমন একটি পে-স্কেল কার্যকর করা হোক, যা তাদের পরিবার, সন্তান এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালনে প্রকৃত সহায়ক হবে। তাদের ভাষায়, “আমরা বিলাসিতা চাই না, শুধু সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার মতো বেতন চাই।”



