ভূমি জরিপে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধে কঠোর সরকার: জেনে নিন স্তরভিত্তিক প্রকৃত সরকারি সেবামূল্য
দেশের সাধারণ ভূমি মালিকদের ডিজিটাল ও ম্যানুয়াল ভূমি জরিপ প্রক্রিয়ায় যেকোনো প্রকার দালালি, হয়রানি এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের হাত থেকে রক্ষা করতে বিশেষ সচেতনতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। “ভূমি মালিকদের সুবিধার্থে স্তরভিত্তিক বিভিন্ন সেবামূল্য” নির্ধারণ করে মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি কার্যালয়ে তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের (তেজগাঁও, ঢাকা) দাপ্তরিক তথ্যচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভূমি জরিপের প্রাথমিক ও প্রধান স্তরগুলোর সিংহভাগ সেবাই সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করছে। অথচ সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক সাধারণ নাগরিক মাঠ পর্যায়ে অসাধু চক্রের শিকার হচ্ছেন।
এক নজরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রাপ্ত প্রধান সেবাসমূহ:
কিস্তোয়ার পর্যায়: সরজমিনে প্রতিটি ভূমি খণ্ড পরিমাপ ও নকশা অংকন।
খানাপুরি পর্যায়: নকশায় দাগ নম্বর দেওয়া এবং ভূমি মালিকের তথ্যাদি সংগ্রহ করে তার নামে খতিয়ান/পর্চা প্রস্তুতকরণ।
বুজারত পর্যায়: প্রস্তুতকৃত খতিয়ান/পর্চা ভূমি মালিকদের মাঝে বিতরণ বা বুঝিয়ে দেওয়া, বিবাদ দায়ের ও শুনানি এবং বদর (পুনরায় পরিমাপ)।
তসদিক (বিধি ২৮): পূর্ববর্তী রেকর্ড ও মালিকানার প্রমাণাদি যাচাই সাপেক্ষে খতিয়ান সত্যায়ন এবং বিবাদ শুনানি।
তসদিক-উত্তর যাচাই: খতিয়ান ও নকশার সঠিকতা যাচাকরণ, যেকোনো ভুল (মিসটেক) সংশোধন এবং নামানুসারে খতিয়ানের নতুন ডিপি (DP) নম্বর প্রদান।
জরিপের বিভিন্ন স্তরে নির্ধারিত সরকারি ফি ও আদালতের ফি (কোর্ট ফি):
ভূমি জরিপের পরবর্তী ধাপগুলোতে নামমাত্র কিছু সরকারি ফি বা কোর্ট ফি প্রযোজ্য রয়েছে, যা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আদালতের স্ট্যাম্প বা ডিসিআর (DCR)-এর মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়। বিস্তারিত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| ক্রম | স্তরের নাম | সেবার বিবরণ | নির্ধারিত সরকারি মূল্য | মন্তব্য / আদায় পদ্ধতি |
| ০১ | তসদিক (বিধি ২৮) | (ক) বদর ফি (প্রথম দাগ)
(খ) অতিরিক্ত প্রতি দাগের জন্য | ০৫/- (পাঁচ) টাকা
০১/- (এক) টাকা | বদর ফি ডিসিআর (DCR)-এর মাধ্যমে নগদ আদায় করতে হবে। |
| ০২ | খসড়া প্রকাশনা
(ডিপি, বিধি ২৯) | (ক) প্রস্তুতকৃত খতিয়ান ও নকশা প্রদর্শন
(খ) আপত্তি মামলা গ্রহণ (প্রতি কেস)
(গ) প্রতি কেসের প্রতি ঠিকানায় প্রসেস ফি
(ঘ) প্রতি ভিন্ন ঠিকানার জন্য অতিরিক্ত ফি | বিনামূল্যে
২০/- (বিশ) টাকা
৫০/- (পঞ্চাশ) টাকা
৫০/- (পঞ্চাশ) টাকা | সরকারি (জেলা প্রশাসক) কেসের কোর্ট ফি মওকুফ, তবে প্রসেস ফি প্রযোজ্য। কোর্ট ফির মাধ্যমে আদায়যোগ্য। |
| ০৩ | আপত্তি (বিধি ৩০) | (ক) আপত্তি মামলা শুনানি ও নিষ্পত্তি
(খ) বদর ফি (প্রথম দাগ)
(গ) পরবর্তী প্রতি দাগ
(ঘ) বদর আমিন / সার্ভেয়ার ফি | বিনামূল্যে
১৫/- (পনের) টাকা
০৩/- (তিন) টাকা
শর্তসাপেক্ষ | ক্যাম্প হতে মৌজার দূরত্ব ৬ মাইলের ঊর্ধ্বে হলে আমিনের ১ দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ প্রদেয়। |
| ০৪ | আপিল (বিধি ৩১) | (ক) আপিল কেস শুনানি ও নিষ্পত্তি
(খ) আপিল মামলা গ্রহণ (প্রতি কেস)
(গ) আপিল প্রতি কেসের প্রতি ঠিকানায় প্রসেস ফি
(ঘ) বদর ফি (প্রথম দাগ) ও পরবর্তী প্রতি দাগ | বিনামূল্যে
৪০/- (চল্লিশ) টাকা
৫০/- (পঞ্চাশ) টাকা
১৫/- এবং ০৩/- টাকা | সরকারি কেসের কোর্ট ফি মওকুফ। বদর ফি ডিসিআর-এর মাধ্যমে নগদ আদায় করতে হবে। |
সচেতনতাই রুখবে দুর্নীতি:
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় দেখা যায় কিছু মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্র প্রথম তিন-চারটি স্তরের বিনামূল্যে থাকা সেবার বিপরীতেও নিরীহ কৃষকদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। আপত্তি ও আপিল মামলার ক্ষেত্রে মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকার সরকারি কোর্ট ফি-এর জায়গায় বড় অংকের টাকা দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, নির্ধারিত ফি-এর অতিরিক্ত একটি টাকাও কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্বত্বভোগীকে দেওয়া যাবে না। যদি কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা এই নির্ধারিত চার্টের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার বা সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয়ের হটলাইনে অভিযোগ জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।



