সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

চিকিৎসা ব্যয়ের রাহুগ্রাস: ঋণের জালে বন্দি দেশের সাধারণ মানুষ

দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এখনো যেন এক দূর আকাশের চাঁদ। আকস্মিক কোনো গুরুতর অসুখ মানেই একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন সাধারণ চাকরিজীবীর মাসিক চিকিৎসা ভাতা যেখানে মাত্র ১,৫০০ টাকা, সেখানে মাত্র ১০ দিনে হাসপাতালের বিল ছাড়িয়ে যাচ্ছে লাখ টাকার ঘর। দেশের চিকিৎসা ব্যয় এতটাই লাগামহীন যে, সাধারণ মানুষের এখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকারটুকু পাওয়ার জন্য চড়া সুদে ঋণ নেওয়া বা ভিটেমাটি বিক্রি করা ছাড়া কোনো বিকল্প পথ থাকছে না।

সম্প্রতি এমনই এক ভুক্তভোগী পরিবারের করুণ চিত্র সামনে এসেছে। রাজধানীর একটি হাসপাতালে গত দশ দিন ধরে চিকিৎসাধীন এক বৃদ্ধ বাবা। চিকিৎসার এখনো অর্ধেকও সম্পন্ন হয়নি, অথচ এর মধ্যেই হাসপাতালের বিল ছাড়িয়ে গেছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা!

১,৫০০ টাকার ভাতা বনাম লাখ টাকার বিল: গণিতের নিষ্ঠুর পরিহাস

যদি হিসাব করা হয়, একজন সরকারি বা বেসরকারি চাকুরিজীবী মাসে ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান, তবে ১০ দিনে জমা হওয়া ১ লাখ ১০ হাজার টাকার এই ন্যূনতম বিলটি পরিশোধ করতে তার দীর্ঘ ৭৩ মাসেরও বেশি (প্রায় ৬ বছর) সম্পূর্ণ চিকিৎসা ভাতা জমা করতে হবে! অথচ এটি চিকিৎসাকালীন একটি আংশিক বিল মাত্র। চিকিৎসা শেষ হতে হতে এই ব্যয় কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা ভাবতেই সাধারণ মানুষের মেরুদণ্ড শিউরে ওঠে।

এর ওপর রয়েছে নিত্যদিনের ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের খরচের বোঝা। এই ভুক্তভোগী পরিবারটিতেই বৃদ্ধ বাবা-মার প্রতি মাসের নিয়মিত ওষুধের পেছনে খরচ হয় ৮,০০০ টাকারও বেশি। অর্থাৎ, প্রতি মাসের বরাদ্দকৃত ভাতার চেয়েও ওষুধের খরচ ৫ গুণেরও বেশি। এই ঘাটতি মেটাতে প্রতি মাসেই সংসারের অন্য খাত থেকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে অথবা ধারদেনার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

‘আউট অব পকেট’ ব্যয়ের শীর্ষে বাংলাদেশ

বিশ্বব্যাংক এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সাম্প্রতিক তথ্য ও বিভিন্ন গোলটেবিল বৈঠকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭৩ থেকে ৭9 শতাংশ খরচ রোগীকে নিজের পকেট থেকে (Out-of-Pocket Expenditure) দিতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। যেখানে উন্নত বা প্রতিবেশী দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ রাষ্ট্র বা স্বাস্থ্যবিমা বহন করে, সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ২.৫ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যবিমার আওতায় রয়েছে।

ফলে উন্নত বা সাধারণ যেকোনো চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ এককভাবে বহন করতে হয় নাগরিককেই। একটি বড় রোগ বা দুর্ঘটনা মানেই একটি সচ্ছল পরিবারের মুহূর্তের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কিছু বাড়লেও (যেমন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ১.০২ শতাংশ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে) তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, এই বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর এক বিবৃতিতে জানান,

“আমাদের দেশে ওষুধের দাম এবং বেসরকারি হাসপাতালের রোগ নির্ণয় (Diagnostic) খরচ সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সিট সংকট এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার কারণে বাধ্য হয়েই মানুষকে ঘটিবাটি বিক্রি করে বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে হয়। রাষ্ট্র সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা (Universal Health Coverage) চালু না করলে এই বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব।”

সাধারণ মানুষের আহাজারি

ভুক্তভোগীদের মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসা এখন আর সেবা নয়, এটি একটি ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে ওষুধের দোকানে আর প্যাথলজি ল্যাবে। এক দিন হাসপাতালে কাটাতে যে টাকা খরচ হয়, তা দিয়ে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার অনায়াসে দুই মাস চলতে পারে।

সাধারণ জনগণের দাবি—শুধু কাগজে-কলমে বাজেট বা নামমাত্র ভাতা বৃদ্ধি নয়; বরং ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে শতভাগ ওষুধ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যবিমা চালু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ চিরদিনের জন্য ঋণের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *