সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে সেবা ভালো, তবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ
সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল (SKH) থেকে সেবা নিয়ে অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করলেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চিকিৎসকের প্রাপ্যতা, রিপোর্ট দেখানো, অনলাইন টিকিট ও জরুরি সময়ে চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন সেবা গ্রহীতারা।
সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালটির সেবা নিয়ে বিভিন্ন রোগী ও স্বজনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হাসপাতালের পরিবেশ, চিকিৎসাসেবার ব্যয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া অনেকের জন্য বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘স্লট পাওয়া যেন সোনার হরিণ’
সেবা গ্রহীতাদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্টের সীমিত স্লট। অনেকেই জানিয়েছেন, প্রয়োজনের সময়ে অনলাইনে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। কখনো কখনো কয়েক দিন থেকে দুই-তিন সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
একজন সেবা গ্রহীতার ভাষ্য, “স্লট পাওয়া যেন সোনার হরিণ।” তার মতে, শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক একটি হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সরকারি কর্মচারীদের জন্য পৃথক হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।
আরেকজন অভিযোগ করেছেন, অধিক রাতে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্টের চেষ্টা করেও সিরিয়াল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। টেস্ট করার পর রিপোর্ট দেখাতেও আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার কারণে চিকিৎসা প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে তিনি জানান।
রিপোর্ট দেখাতেও নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে অসন্তোষ
সেবা গ্রহীতাদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখানোর জন্য পুনরায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। তাদের মতে, চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানোর পর রিপোর্ট হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে তা দেখানোর সুযোগ থাকা উচিত।
একজন রোগীর স্বজন বলেন, রিপোর্ট দেখানোর জন্য আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ‘বিরক্তিকর’। তার মতে, অন্তত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করা পরীক্ষার রিপোর্ট দেখাতে আলাদা অ্যাপয়েন্টমেন্টের বাধ্যবাধকতা না থাকলে রোগীদের ভোগান্তি অনেক কমবে।
সেবা গ্রহীতাদের কেউ কেউ আগের মতো সরাসরি টিকিট কেটে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
জরুরি রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা চাওয়া
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া রোগীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষা করা সম্ভব নয়—এমন মতও এসেছে। অনেকের প্রশ্ন, জরুরি সময়ে চিকিৎসক দেখানোর প্রয়োজন হলেও যদি সাত-আট দিন আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়, তাহলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন কয়েকজন সেবা গ্রহীতা।
তাদের মতে, নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি আকস্মিক অসুস্থতার জন্য একটি কার্যকর ‘জরুরি রেফারেল’ ব্যবস্থা থাকলে হাসপাতালের সেবার মান আরও বাড়তে পারে।
‘সিনিয়র ডাক্তার নেই’—এমন অভিযোগও
অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের চিকিৎসক কাঠামো নিয়েও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। একজন সেবা গ্রহীতা বলেছেন, হাসপাতালের সেবা ভালো হলেও সিনিয়র চিকিৎসকের উপস্থিতি পর্যাপ্ত নয় বলে তার মনে হয়েছে।
তবে এ ধরনের মন্তব্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা হয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকসংখ্যা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি বা রোগী-চিকিৎসক অনুপাত নিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য ছাড়া বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
অনলাইন ব্যবস্থায় OTP নিয়েও ভোগান্তি
অনলাইন সেবার ক্ষেত্রে OTP-সংক্রান্ত সমস্যার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, রিপোর্ট সংগ্রহ বা অনলাইন সেবা নিতে গিয়ে অনেক সময় OTP আসে না। আবার OTP এলেও সেটি দেওয়ার পর ভুল দেখানোর সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
একজন সেবা গ্রহীতা বলেন, আগে এ ধরনের সমস্যা ছিল না; বর্তমানে অনলাইন ব্যবস্থায় OTP নিয়ে সমস্যার কারণে সেবা গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাকে আরও সহজ, নির্ভরযোগ্য ও ব্যবহারবান্ধব করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
টিকিট কাউন্টার নিয়েও পরিবর্তনের দাবি
হাসপাতালের টিকিট ব্যবস্থাপনা নিয়েও কিছু সেবা গ্রহীতা অসন্তোষ জানিয়েছেন। তাদের মতে, যে তলায় চিকিৎসক দেখানো হয়, সেই তলায় টিকিট কাউন্টার না থাকায় রোগী ও স্বজনদের অন্য তলায় গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়।
একজন সেবা গ্রহীতার প্রস্তাব, চিকিৎসকের বিভাগ বা ফ্লোরভিত্তিক টিকিট কাউন্টার রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে হাসপাতালের সেবা গ্রহণের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের দাবি
কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য হাসপাতালের সেবায় আলাদা সময় নির্ধারণের দাবিও উঠেছে। একজন সেবা গ্রহীতার মতে, কর্মঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে অফিসের দায়িত্ব পালনে সমস্যা হয়। আবার হাসপাতালে চিকিৎসা, এক্স-রে, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
এ কারণে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তার মতে, এতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসের সময়ের বাইরে চিকিৎসা নিতে পারবেন এবং কর্মস্থলেও অনুপস্থিত থাকতে হবে না।
এ ছাড়া সপ্তাহের নির্দিষ্ট দুই দিন সরকারি কর্মচারীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে।
বিভাগীয় শহরে হাসপাতাল স্থাপনের দাবি
ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবার চাপ কমাতে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাসপাতাল স্থাপনের দাবিটি সেবা গ্রহীতাদের মন্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
তাদের যুক্তি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হলে সময়, অর্থ ও কর্মঘণ্টা—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে। বিভাগীয় শহরে এ ধরনের হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলে স্থানীয় পর্যায়েই অনেক সেবা পাওয়া সম্ভব হবে।
একজন সেবা গ্রহীতা বলেন, তার ব্যক্তিগত লাভ না হলেও দেশের মানুষের সুবিধার জন্য প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন।
হাসপাতালের পরিবেশ ও কম খরচের সেবায় প্রশংসা
তবে অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতালটির পরিবেশ ও সেবা নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন অনেকে।
একজন সেবা গ্রহীতা তার মায়ের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাসপাতালের পরিবেশের প্রশংসা করেছেন। তিনি জানান, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ অনেক সেবা বিনামূল্যে বা কম খরচে পাওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তার মতে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এমন হাসপাতাল একটি ভালো উদ্যোগ।
অর্থাৎ, সেবা গ্রহীতাদের মতামতে হাসপাতালটির মূল সেবা কাঠামো নিয়ে সন্তুষ্টির পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রোগীর চাপই কি মূল কারণ?
সেবা গ্রহীতাদের মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাগুলোর একটি বড় অংশের পেছনে হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকতে পারে। রোগীর সংখ্যা যদি হাসপাতালের সক্ষমতার তুলনায় বেশি হয়, তাহলে সীমিত চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সক্ষমতা ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট দিয়ে সবার চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে শুধু অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা পরিবর্তন নয়, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ানো, বিভাগীয় শহরে নতুন হাসপাতাল স্থাপন, পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি রোগীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
সেবা সহজ করার কয়েকটি প্রস্তাব
সেবা গ্রহীতাদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সেবা আরও সহজ করতে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে—
- জরুরি রোগীদের জন্য পৃথক দ্রুত চিকিৎসা বা রেফারেল ব্যবস্থা চালু করা;
- রিপোর্ট দেখানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় পুনরায় অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রয়োজনীয়তা কমানো;
- অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লটের সংখ্যা ও সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা;
- OTP ও অনলাইন টিকিট ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা;
- প্রয়োজন অনুযায়ী অফলাইন টিকিটের সুযোগ রাখা;
- চিকিৎসকের ফ্লোর অনুযায়ী টিকিট কাউন্টার বা সহায়তা ডেস্ক স্থাপন;
- কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অফিস-পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট চিকিৎসাসেবা চালুর বিষয়টি বিবেচনা;
- বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র চিকিৎসকের উপস্থিতি বাড়ানো;
- রোগীর চাপ কমাতে বিভাগীয় শহরগুলোতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন।
‘সুন্দর হাসপাতাল, কিন্তু সেবা পাওয়াটাও সহজ হতে হবে’
সব মিলিয়ে সেবা গ্রহীতাদের মন্তব্যে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের প্রতি একদিকে আস্থা ও সন্তুষ্টি, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনাগত কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। হাসপাতালের পরিবেশ, কম খরচে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকে।
তবে তাদের মূল বক্তব্য—হাসপাতাল যত আধুনিক বা সুন্দরই হোক, রোগীর প্রয়োজনের সময়ে চিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
তাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা সহজ করা, জরুরি রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা এবং রাজধানীর বাইরে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের চিকিৎসা ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলে মনে করছেন সেবা গ্রহীতারা।



