নবম পে-স্কেল: আবারও নতুন কমিটি, এবার কি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত—নাকি অপেক্ষার পালা আরও দীর্ঘ?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও নতুন কমিটি গঠন করেছে সরকার। এবার কমিটির নেতৃত্বে রাখা হয়েছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে। জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার লক্ষ্যে এ উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নতুন কমিটি গঠনের খবর সামনে আসার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে একদিকে যেমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পে-স্কেল নিয়ে একের পর এক কমিটি, পর্যালোচনা, বৈঠক ও সুপারিশের কারণে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন—এবারও কি শুধু কমিটি গঠনেই সীমাবদ্ধ থাকবে প্রক্রিয়া, নাকি সত্যিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের দিকে যাবে সরকার?
কমিটিতে কারা রয়েছেন?
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি করে গঠিত সাত সদস্যের কমিটিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী কমিটির সদস্যরা হলেন—
- আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী — অর্থমন্ত্রী ও কমিটির সভাপতি
- সালাহউদ্দিন আহমদ — স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- ইকবাল হাসান মাহমুদ — জ্বালানি মন্ত্রী
- অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন — সমাজকল্যাণমন্ত্রী
- মো. আসাদুজ্জামান — আইনমন্ত্রী
- ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর — অর্থ উপদেষ্টা
- মো. আব্দুল বারী — জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী
নতুন কমিটির মূল কাজ হবে সংশ্লিষ্ট পে-কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা।
‘কমিটি’ শব্দেই কি শেষ হবে পে-স্কেলের গল্প?
নবম পে-স্কেল নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার জায়গাটি এখানেই। এর আগে পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে সচিব পর্যায়ের কমিটি, পর্যালোচনা, বৈঠক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির খবর এসেছে। ফলে নতুন করে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের খবরে অনেকের প্রশ্ন—যদি প্রতিবেদন, সুপারিশ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি আগেই হয়ে থাকে, তাহলে আবার নতুন কমিটির প্রয়োজন হলো কেন?
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা কর্মচারীদের একটি অংশ মনে করছেন, কমিটি গঠন মানেই বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নয়। তাদের আশঙ্কা, নতুন কমিটি যদি আবার দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবেদন পর্যালোচনা, আর্থিক সক্ষমতা যাচাই ও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালায়, তাহলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ভিন্ন। একটি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ব্যয়, বাজেট ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন গ্রেডের বেতন-ভাতার সামঞ্জস্য এবং অন্যান্য আর্থিক দায় জড়িত। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এসব বিষয় যাচাই করার প্রয়োজন থাকতেই পারে। এর আগে অর্থমন্ত্রীও পে-স্কেলের সুপারিশ পর্যালোচনা ও দেশের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনার কথা জানিয়েছিলেন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাস্তবায়নের সময়সূচি কোথায়?
সরকারি কর্মচারীদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন কমিটি গঠন নয়; বরং কবে সিদ্ধান্ত হবে, কবে প্রজ্ঞাপন হবে এবং কবে নতুন বেতন বাস্তবে হাতে পাওয়া যাবে—এটাই গুরুত্বপূর্ণ।
নবম পে-স্কেল নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, গেজেট প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও গেজেট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার কথা জানানো হয়েছে।
এ কারণে নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি নিয়ে দুটি সম্ভাবনা সামনে এসেছে। প্রথমত, এটি হতে পারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে শেষ পর্যায়ের নীতিগত যাচাই। দ্বিতীয়ত, এটি যদি নতুন করে দীর্ঘ পর্যালোচনার সূচনা করে, তাহলে বাস্তবায়নের সময় আরও পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
কর্মচারীদের প্রত্যাশা: এবার ‘কমিটি’ নয়, চাই সিদ্ধান্ত
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে তা হলো—নবম পে-স্কেল নিয়ে আর কত আলোচনা ও পর্যালোচনা হবে?
একজন সরকারি কর্মচারীর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পরিবর্তনের আশ্বাস, কমিটি, বৈঠক ও সুপারিশের খবর শুনতে শুনতে কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন অনেকটাই বাস্তব সিদ্ধান্তের দিকে। তাদের মতে, নতুন কমিটি যদি গঠিত হয়, তাহলে সেই কমিটির কাজের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা প্রয়োজন।
অর্থাৎ কমিটি গঠনের পর কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে, কোন বিষয়গুলো চূড়ান্ত করবে এবং সরকারের কাছে কী সুপারিশ যাবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকলে কর্মচারীদের আস্থাও বাড়বে।
‘ঝুলন্ত আশ্বাস’ নয়, এবার দৃশ্যমান অগ্রগতি চান চাকরিজীবীরা
নবম পে-স্কেলকে কেন্দ্র করে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা কেবল বেতন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে একই জাতীয় বেতন কাঠামোর আওতায় থাকার কারণে নতুন বেতন কাঠামোকে তারা সময়ের প্রয়োজন হিসেবে দেখছেন।
তাই নতুন কমিটি গঠনের পর এখন নজর থাকবে কমিটি কত দ্রুত কাজ শেষ করে এবং সরকার কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়—তার ওপর।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—কমিটি, কমিটি আর কমিটি—এরপর কি সত্যিই নবম পে-স্কেলের বাস্তবায়ন হবে? নাকি আগের বিভিন্ন কমিটির মতো এবারও সরকারি চাকরিজীবীদের সামনে অপেক্ষার আরেকটি নতুন অধ্যায় তৈরি হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে নতুন কমিটির কার্যক্রম, সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারির বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। নতুন কমিটি গঠনকে তাই আপাতত চূড়ান্ত বাস্তবায়নের ঘোষণা হিসেবে নয়, বরং বাস্তবায়নের পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এখন সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা একটাই—আর কোনো ঝুলন্ত আশ্বাস নয়, এবার যেন কমিটির পর আসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন।


