নবম পে-স্কেল ২০২৬ : আজ সকাল ১০টায় সচিব কমিটির আরও এক বৈঠকের জোর সম্ভাবনা, চূড়ান্ত সুপারিশের পথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। গতকাল (১৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সচিব কমিটির দীর্ঘ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সুপারিশমালা সম্পূর্ণ চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আজ (১৬ জুলাই) সকাল ১০টায় সচিব কমিটির আরেকটি ফলো-আপ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গতকালকের বৈঠকে পে-স্কেলের আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও মতৈক্যের প্রয়োজন দেখা দেওয়ায় আজকের সম্ভাব্য বৈঠকে সেগুলো চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হতে পারে।
গতকালের বৈঠকে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে
সচিব কমিটির বৈঠকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৈষম্য কমানোর বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ
আলোচনায় নবম পে-স্কেল একবারে বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিন ধাপে কার্যকর করার প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে। আলোচনায় উঠে এসেছে, প্রথম ধাপে মূল বেতন (Basic Salary) বৃদ্ধি করা হতে পারে। পরবর্তী দুই ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে সরকারের ওপর এককালীন অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমানো এবং অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
নতুন গ্রেড কাঠামো নিয়েও আলোচনা
বৈঠকে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবে—
- ২০তম গ্রেডের বেতন ৪৮,৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
- ১ম গ্রেডের বেতন ১,৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া বিদ্যমান ২০টি গ্রেডের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে নাকি প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো পরিবর্তন আনা হবে—সেই বিষয়েও মতামত বিনিময় হয়েছে।
ইনক্রিমেন্ট নীতিতে বড় পরিবর্তনের আলোচনা
গতকালকের আলোচনায় বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠে এসেছে। বিদ্যমান সমান হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পরিবর্তে গ্রেডভিত্তিক ভিন্ন হার নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—
- ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড: ৫ শতাংশ
- ৫ম গ্রেড: ৪ শতাংশ
- ৩য় ও ৪র্থ গ্রেড: ৩.৫ শতাংশ
- ২য় গ্রেড: ২.৭৫ শতাংশ
এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য হলো নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা নিশ্চিত করা।
ভাতা নিয়েও কাটছাঁটের আলোচনা
বেতন কমিশনের সুপারিশের তুলনায় সচিব কমিটির আলোচনায় কয়েকটি ভাতার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম অঙ্কের প্রস্তাব উঠে এসেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী—
- চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৩,০০০ টাকা হতে পারে (কমিশনের সুপারিশ ছিল ৫,০০০ টাকা)।
- সন্তানদের জন্য শিক্ষা ভাতা মাসিক ১,৫০০ টাকা নির্ধারণের আলোচনা হয়েছে (কমিশনের সুপারিশ ছিল ২,০০০ টাকা)।
তবে এসব বিষয় এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আইএমএফের উদ্বেগও আলোচনায়
গত ১২ জুলাই ঢাকায় সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দল দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একসঙ্গে বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সে প্রেক্ষাপটে সচিব কমিটি মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব পরিস্থিতি এবং সরকারের ব্যয় সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়েও বিশদ পর্যালোচনা করেছে।
আজকের সম্ভাব্য বৈঠকে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে
আজ সকাল ১০টায় সম্ভাব্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে সেখানে মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তের চেষ্টা হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- চূড়ান্ত সুপারিশমালা প্রস্তুত করা।
- যেসব বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে সেগুলোর নিষ্পত্তি।
- পে-স্কেল বাস্তবায়নের আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনা।
- সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার iBAS++-এ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের রূপরেখা নির্ধারণ।
- চূড়ান্ত সুপারিশ প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত অনুমোদন এবং পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা।
কবে কার্যকর হতে পারে নতুন পে-স্কেল?
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রগুলোর মতে, সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পরও প্রজ্ঞাপন জারি, আইনগত প্রক্রিয়া, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। সে কারণে বর্ধিত হারে বেতন বাস্তবে অক্টোবর মাসের দিকে পরিশোধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনার কথা আলোচনা হচ্ছে।
তবে আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল অনুমোদিত হলে তা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে প্রাপ্য বকেয়া অর্থ পরবর্তীতে সমন্বয় করে পরিশোধের সুযোগ থাকতে পারে।
এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
উল্লেখ্য, সচিব কমিটির আলোচনা, বিভিন্ন খসড়া প্রস্তাব এবং সম্ভাব্য সুপারিশ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চললেও সরকার এখনও নবম জাতীয় পে-স্কেলের কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন বা প্রজ্ঞাপন জারি করেনি। ফলে বেতন কাঠামো, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা কিংবা বাস্তবায়নের সময়সূচি—সব বিষয়ই সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে।



