বাজেটের আগেই নবম পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রত্যাশা: প্রধানমন্ত্রীকে সরকারি কর্মচারীদের খোলা চিঠি
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগেই সরকারের পক্ষ থেকে নতুন পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে জোরালো আশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। গতকাল সোমবার (২৫ মে) সংগঠনের আহ্বায়ক আবদুল মালেক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক খোলা চিঠিতে এই দাবি ও প্রত্যাশার কথা জানান।
স্মারকলিপি পেশ ও আসন্ন বাজেটে বরাদ্দের দাবি
খোলা চিঠিতে জানানো হয়, নবম পে-স্কেল শতভাগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ রেখে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা। চিঠিতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলা হয়, নিয়মানুযায়ী দীর্ঘ ১১ বছরে সরকারি কর্মচারীদের দুটি পে-স্কেল পাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে তারা একটিও পাননি।
‘২০১৫ সালের বেতন দিয়ে ২০২৬ সালে চলা অসম্ভব’
কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক দেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রতিবছর দ্রব্যমূল্য ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেলেও কর্মচারীদের বেতনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন:
“২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের বেতন কাঠামো দিয়ে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এই ঊর্ধ্বমুখী যুগে কি টিকে থাকা সম্ভব?”
তিনি আরও জানান, প্রায় দুই-তিন বছর আগেই অসংখ্য কর্মচারী তাদের নিজ নিজ গ্রেডের বেতনের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছেন। পরবর্তী কোনো ধাপ বা স্কেল না থাকায় তাদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টও সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা কর্মচারীদের আর্থিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
ঋণের জালে জর্জরিত কর্মচারীদের মানবেতর জীবন
চিঠিতে সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দেশের প্রতিটি কর্মচারী বর্তমানে ঋণের দায়ে জর্জরিত। প্রভিডেন্ট ফান্ড কিংবা ব্যাংক থেকে একাধিক লোন বা ঋণ গ্রহণ করার কারণে মাস শেষে কিস্তি কর্তনের পর যে বেতন অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিনও সংসার চালানো সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে টিকে থাকাই সাধারণ কর্মচারীদের জন্য দায় হয়ে পড়েছে।
উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত ২২ লাখ পরিবার
প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবদুল মালেক বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের জন্য আপনি অবশ্যই চিন্তা করছেন এবং নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেজন্য কৃতজ্ঞতা।” তবে একই সাথে তিনি কর্মচারীদের সামাজিক ও পারিবারিক গ্লানির কথা তুলে ধরে বলেন, বিগত ১১ বছরে ২২টি ঈদ সরকারি কর্মচারীরা পুরোনো কাপড়-চোপড় পরেই পার করেছেন। অধিকাংশ কর্মচারীই জানেন না ঈদ উৎসবের প্রকৃত আনন্দ কী।
আসন্ন ঈদুল আজহার প্রসঙ্গ টেনে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে জানান:
একজন সাধারণ কর্মচারী উৎসব ভাতা বা বোনাস হিসেবে মাত্র ৮ থেকে ১০-১২ হাজার টাকা পান।
বর্তমান বাজারে এই সীমিত টাকা দিয়ে কোরবানির গরুর অংশীদার হওয়া তো দূরের কথা, তা স্বপ্নেও ভাবা যায় না।
এর ফলে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং নিজ স্ত্রী-সন্তানদের কাছে কর্মচারীদের মাথা নিচু করে থাকতে হয়।
তিনি উল্লেখ করেন, প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে এটি যেমন কর্মচারীদের জন্য লজ্জার, তেমনি সরকারপ্রধান হিসেবে এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সম্মান রক্ষা ও দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান
আবদুল মালেক স্মরণ করিয়ে দেন যে, সরকারি কর্মচারীরা রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত থাকায় স্থানীয় এলাকার মানুষ নানা ভরসা নিয়ে তাদের কাছে আসেন। তাই রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে কর্মচারীদের সামাজিক সম্মান বজায় রাখা সরকারেরই দায়িত্ব। দেশের ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের দাবি—আসন্ন বাজেটে যেন নবম পে-স্কেলের শতভাগ মূল বেতন বাস্তবায়ন করা হয়।
সবশেষে তিনি সতর্ক ও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বেশি সময় নিলে বাজারে দ্রব্যমূল্য আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে আসন্ন বাজেটের আগেই যদি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক পে-স্কেলের ঘোষণা আসে, তবেই মাঠপর্যায়ের কর্মচারী অঙ্গনে প্রকৃত স্বস্তি ফিরে আসবে।


