৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

এক দশকে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হয়নি: নবম পে-স্কেল চালুর উদ্যোগ ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কি কি?

পাঁচ বছর পরপর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা পর্যালোচনার বিধান থাকলেও দীর্ঘ এক দশকে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এই দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে অবশেষে নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাকে বিশ্লেষকরা সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বলে মনে করছেন। তবে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে সরকার।

বাজেটে বড় অংকের বরাদ্দ ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। এর সাথে পেনশন ও গ্রাচুইটি যুক্ত করলে এ খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকাই সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালুর উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।

সরকার সূত্রে আরও জানা গেছে, একবারে পুরো চাপ না নিয়ে বেতন-ভাতা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু মূল বেতন বা বেসিক বৃদ্ধি করার চিন্তা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করেই সরকার এই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে চায়।

রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপ

বেতন বৃদ্ধির এই উদ্যোগের পেছনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আয়ের ধীরগতি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ব্যয় বা বেতন-ভাতা বাড়লেও সেই অনুপাতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ছে না। ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকারকে দেশি বা বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা হলে তা দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎস বা দেশীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

আইএমএফের উদ্বেগ ও পরামর্শ

নতুন পে-স্কেল ঘোষণার এই প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সম্প্রতি অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে পৃথক বৈঠকে সংস্থাটি বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

আইএমএফের মূল পর্যবেক্ষণগুলো হলো:

  • রাজস্ব ঘাটতি: সরকারের রাজস্ব আয় এখনও আশানুরূপ নয়, ফলে বড় অংকের বেতন বৃদ্ধি বাজেট ঘাটতির চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

  • মূল্যস্ফীতি ঝুঁকি: দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হবে, যা ভোগব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এ সকল ঝুঁকি এড়াতে আইএমএফ নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও ধীরগতির নীতি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একদিকে দীর্ঘদিনের বঞ্চিত চাকরিজীবীদের দাবি পূরণ এবং অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখার এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ সরকার কীভাবে মোকাবিলা করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *