৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

অর্থনৈতিক চাপ ও আইএমএফের আপত্তি: নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা, তবে অক্টোবরের আগেই গেজেটের প্রস্তুতি

বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্ক অবস্থানের কারণে প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশাসনিক, আর্থিক ও আইনি প্রস্তুতি এখনো সম্পূর্ণ না হওয়ায় চূড়ান্ত ঘোষণা বিলম্বিত হলেও সরকারের অভ্যন্তরে কাজ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সচিব কমিটির সুপারিশ সমন্বয় এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন সম্পন্ন হলে নতুন পে-স্কেল নিয়ে বড় ধরনের ঘোষণা আসতে পারে।

আইএমএফের পরামর্শ: আরও দুই বছর অপেক্ষার সুপারিশ

অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ঢাকা সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে নবম পে-স্কেলের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ওই আলোচনায় সংস্থাটি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

আইএমএফের আশঙ্কা, এই মুহূর্তে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। এর ফলে বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি, সরকারি ঋণের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারের অবস্থান: বিলম্ব নয়, অক্টোবরের আগেই গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি

তবে সরকার আইএমএফের সুপারিশ পুরোপুরি অনুসরণ করার পক্ষে নয়। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ-ও- বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আগেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

সরকারের ধারণা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এবং আর্থিক বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা সম্ভব হবে। এ কারণে বিষয়টি দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখতে সরকার আগ্রহী নয়।

কেন বিলম্ব হচ্ছে?

অর্থনীতিবিদ ও সচিবালয় সূত্র বলছে, মূলত দুটি বড় কারণে নবম পে-স্কেলের চূড়ান্ত অনুমোদন পিছিয়ে যাচ্ছে।

১. অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকার অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশনসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কিন্তু নবম পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমান রাজস্ব ঘাটতির প্রেক্ষাপটে এই অর্থের সংস্থান সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

২. মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির উদ্বেগ

আইএমএফের মতে, একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবেশ করলে বাজারে নগদ প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এছাড়া রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলে অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মন্ত্রিসভায় উঠতে পারে প্রস্তাব

অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রস্তাব মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত করছে বলে জানা গেছে। চলতি সপ্তাহের শেষদিকে অথবা আগামী সপ্তাহের যেকোনো মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উপস্থাপন করা হতে পারে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।

উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিস্তারিত পর্যালোচনা

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সচিব কমিটির সুপারিশ, বাস্তবায়ন কৌশল, সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব এবং আইএমএফের পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, পে-স্কেল সংক্রান্ত ফোকাল কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন বলে জানা গেছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা নবম জাতীয় পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন করা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমান বেতন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে তাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের পরামর্শ বিবেচনায় সরকারকে এখন ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

সারসংক্ষেপ

বর্তমান পরিস্থিতিতে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া পুরোপুরি থেমে যায়নি; বরং আর্থিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। আইএমএফ বাস্তবায়ন বিলম্বের পরামর্শ দিলেও সরকার তুলনামূলক দ্রুত গেজেট প্রকাশের লক্ষ্যে কাজ করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে অর্থায়নের সক্ষমতা, সচিব কমিটির সুপারিশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনের তথ্য বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সূত্র, অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকার এখনো নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ বা বাস্তবায়নের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। তাই বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন হিসেবে বিবেচিত।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *