সচিব কমিটির সবুজ সংকেত : ১ জুলাই থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন পে-স্কেল, বেতন বাড়ছে গড়ে ১০০%
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত রূপরেখা পেল নবম জাতীয় পে-স্কেল। গতকাল ২১ মে (বৃহস্পতিবার) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটির সভায় এই নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। বৈশ্বিক ও দেশীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বস্তি দিতে আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই এই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাজেট বৈঠকের সূত্র ধরে জানা গেছে, এবারের বেতন কাঠামোতে নিচের স্তরের কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত সুপারিশের মূল বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
নতুন পে-স্কেলের মূল আকর্ষণ ও পরিবর্তনের চিত্র
বিগত ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর দীর্ঘ ১১ বছর পর এই নতুন কাঠামো আসছে। এবারের সুপারিশে বেতন বৈষম্য কমাতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
| বিবরণ | বর্তমান কাঠামো (২০১৫) | প্রস্তাবিত ৯ম পে-স্কেল (২০২৬) | পরিবর্তনের হার |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড) | ৮,২৫০ টাকা | ২০,০০০ টাকা | প্রায় ১৪২% বৃদ্ধি |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন (১ম গ্রেড) | ৭৮,০০০ টাকা | ১,৬০,০০০ টাকা | প্রায় ১০৫% বৃদ্ধি |
| বেতনের অনুপাত (সর্বনিম্ন:সর্বোচ্চ) | ১ : ৯.৪ | ১ : ৮ | বৈষম্য হ্রাস |
| বিদ্যমান গ্রেড সংখ্যা | ২০টি | ২০টি (বহাল) | অপরিবর্তিত |
গুরুত্বপূর্ণ নোট: নতুন কাঠামোতে কর্মচারীদের মূল বেতন গড়ে ১০০% বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের (১১ থেকে ২০তম গ্রেড) কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত ছুঁয়েছে, যা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীদের বাজারদরের সাথে মানিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
৩ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
বর্তমান দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে এই বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সরকার একবারে না নিয়ে ৩টি আলাদা অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
প্রথম ধাপ (১ জুলাই ২০২৬ থেকে): নতুন অর্থবছর শুরুর সাথে সাথেই মূল বেতনের একটি বড় অংশ (সম্ভাব্য ৫০%) কার্যকর হবে। চাকরিজীবীরা বর্তমানে যে ১০% মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন, তা এই নতুন স্কেলের সাথে সমন্বয় করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২০২৮ অর্থবছর): এই ধাপে মূল বেতনের বাকি অংশ পুরোপুরি সমন্বয় করে চূড়ান্ত মূল বেতন দেওয়া শুরু হবে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২০২৯ অর্থবছর): এই শেষ ধাপে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য সব ভাতা নতুন কাঠামো অনুযায়ী একযোগে কার্যকর করা হবে। (ততদিন পর্যন্ত অন্যান্য ভাতা আগের নিয়মেই বহাল থাকবে)।
একবারে এটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের অতিরিক্ত ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো, তবে মহার্ঘ ভাতা সমন্বয় এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
পেনশনভোগীদের জন্য বড় সুখবর
নতুন পে-স্কেলে দেশের প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীদের জন্য বিশেষ চমক রাখা হয়েছে। যারা তুলনামূলক কম পেনশন পান, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বড় অঙ্কের বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে:
২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন প্রায় ১০০% পর্যন্ত বাড়ছে।
২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে যাদের পেনশন, তাদের বাড়বে প্রায় ৭৫%।
৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৫%।
এছাড়া প্রবীণদের সুরক্ষায় ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস ও নতুন বিধিমালা
এবারের সভায় শুধু সরকারি খাতই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজারের ভারসাম্য রক্ষায় বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের বোনাস ও উৎসব ভাতার বিষয়ে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মচারীদের উৎসব ভাতার একটি আইনি কাঠামো তৈরি হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পরবর্তী প্রক্রিয়া কী?
সচিব কমিটির চূড়ান্ত হওয়া এই সুপারিশমালা অতি দ্রুতই অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সবুজ সংকেত মেলার পরপরই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
এই নতুন পে-স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়—বরং শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, বিচার বিভাগীয় কর্মচারী এবং মাঠ পর্যায়ের স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।


