বেতন বৈষম্যের ফাঁদে সরকারি ও বেসরকারি খাত : নেপথ্যে কি কর্পোরেট ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ?
ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি অদৃশ্য রূপ আজও যেন স্পষ্ট দেশের বেতন কাঠামোতে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলের অংশ হিসেবে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এমন এক স্তরে রাখা হয়, যা বর্তমান বাজারদরের সাথে চরমভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ। এর ফলে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমলাতন্ত্র ও কর্পোরেট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী নিজেদের আখের গোছাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
১. ‘নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘পুকুর চুরি’র আমলাতান্ত্রিক সমীকরণ
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের কম বেতনের ফাঁদে ফেলে অপরাধে বাধ্য করার পেছনে রয়েছে গভীর প্রশাসনিক রাজনীতি। কর্মচারীরা যখন বাধ্য হয়ে ছোটখাটো আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে, তখন আমলারা তাদের খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। কর্মচারীদের এই ‘দুর্বলতা’র সুযোগ নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড় বড় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার ‘পুকুর চুরি’ বা মেগা দুর্নীতি বাস্তবায়ন করা সহজ হয়। কারণ, নিচের স্তরের কর্মচারীরা তখন আর উপর মহলের অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলার নৈতিক সাহস পান না।
২. বেসরকারি খাতের দ্বিগুণ বেতনের কৌশল ও সুশীল সমাজ
অন্যদিকে, দেশের কর্পোরেট ব্যবসায়ী ও তথাকথিত সুশীল সমাজের একাংশ সরকারি বেতন কাঠামোকে সবসময় একটি অযৌক্তিক ও নিম্ন পর্যায়ে আটকে রাখতে চায়। তাদের এই চাওয়ার পেছনে রয়েছে নিখুঁত ব্যবসায়িক হিসাব।
সহজ কথায়, সরকারি বেতন যদি কম থাকে, তবে বেসরকারি খাতও তুলনামূলক কম বেতনে ভালো মানের জনবল ধরে রাখতে পারে। কর্পোরেট খাতের একটি অলিখিত নিয়ম হলো—সরকারি খাতের চেয়ে দ্বিগুণ বেতন দিয়ে মেধাবীদের আকৃষ্ট করা।
বেতন কাঠামোর একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| পদের স্তর | সরকারি খাতের বর্তমান স্কেল (আনুমানিক) | বেসরকারি খাতের সমমানের স্কেল (দ্বিগুণ নীতি) |
| নিম্ন গ্রেড / প্রারম্ভিক | ৮,০০০ টাকা | ১৬,০০০ টাকা |
| উচ্চ পর্যায় / সাকুল্য | ১,০০,০০০ টাকা | ২,০০,০০০ টাকা |
৩. সরকারি স্কেল বাড়লে কর্পোরেটদের যে ‘ভয়’
যদি সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য বেতন কাঠামো যৌক্তিক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়, তবে বেসরকারি খাতের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
হিসাব ও সমীকরণ:
সরকারি কর্মচারীদের বেতন যদি সর্বনিম্ন ২০,০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা (সাকুল্য বা গ্রস বেতন ৩০ হাজার থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা) করা হয়, তবে দ্বিগুণ নীতি বজায় রাখতে গিয়ে বেসরকারি কর্পোরেট খাতকে তাদের বেতন কাঠামো ৬০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত করতে হবে।
এই বাড়তি খরচ এড়াতে এবং অত্যন্ত স্বল্প খরচে নিজেদের প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক কাজ চালিয়ে নিতেই বেসরকারি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো যৌক্তিক বেতন কাঠামো দাঁড়াতে দিতে চায় না।
৪. গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, এই কর্পোরেট সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থরক্ষায় দেশের সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের একটি অংশকে প্রভাবিত বা নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি বা আলোচনা ওঠে, তখনই তথাকথিত সুশীল সমাজ ও মিডিয়ার মাধ্যমে ‘বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাবে’ কিংবা ‘জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে’—এমন প্রচার চালিয়ে একটি অমানবিক বেতন কাঠামো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে একটাই, যেন বেসরকারি খাতের বেতন-ভাতাও কম পরিশ্রমে ও কম খরচে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
উপসংহার:
একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রে ব্রিটিশ আমলের নিয়ন্ত্রণ বিধি বা কর্পোরেটদের পকেট ভারী করার কৌশল চলতে পারে না। সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি মানবিক ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা না গেলে প্রশাসন থেকে দুর্নীতি যেমন দূর হবে না, তেমনি বেসরকারি খাতের সাধারণ কর্মীরাও কর্পোরেট শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাবেন না। তাই বাজার ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বাধীন ও ন্যায্য জাতীয় বেতন কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি।


