৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

পে-স্কেল নিয়ে নতুন শঙ্কা: কমিশনের সুপারিশ কাটছাঁট, নিম্নগ্রেডের ভাগ্যে কি আবারও হতাশা?

নতুন জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও উদ্বেগ—দুটিই এখন তুঙ্গে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন গ্রেডে প্রায় ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে সচিব কমিটির পর্যালোচনায় বিশেষ করে নিম্নগ্রেডের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব কমে যাওয়ার খবর সামনে এসেছে।

ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি অংশের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—কমিশনের সুপারিশ থেকে সচিব কমিটি, এরপর মন্ত্রিপরিষদ—প্রতিটি ধাপে যদি কাটছাঁট হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কর্মচারীদের হাতে কতটুকু বেতন বৃদ্ধি থাকবে?

কমিশনের ২০ হাজার, আলোচনায় ১৬ হাজার ৫০০

প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় বেতন কমিশন ২০১৫ সালের জাতীয় পে-স্কেলের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। একই সঙ্গে গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত রাখার প্রস্তাবের কথাও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে সচিব কমিটির সুপারিশ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিম্নগ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। বর্তমান ২০তম গ্রেডের ৮ হাজার ২৫০ টাকার ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করলে নতুন বেসিক দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। এ কারণেই ২০ হাজার টাকার কমিশন-সুপারিশের তুলনায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকার অঙ্কটি নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৬ হাজার ৫০০ টাকা এখনো চূড়ান্ত জাতীয় পে-স্কেল নয়। এটি সচিব কমিটির সুপারিশ/আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অঙ্ক হিসেবে বিভিন্ন সংবাদ ও কর্মচারী সংগঠনের বক্তব্যে এসেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সরকারের অনুমোদন ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের ওপর।

২০১৫ সালের অভিজ্ঞতাই বাড়াচ্ছে শঙ্কা

কর্মচারীদের বর্তমান উদ্বেগের বড় কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা। ২০১৫ সালের পে-স্কেল প্রণয়নের সময় কমিশনের সুপারিশ এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত কাঠামোর মধ্যে পার্থক্য ছিল।

তৎকালীন ফরাসউদ্দিন কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ১১ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা রাখার কথা ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণে উল্লেখ রয়েছে। পরে সচিব কমিটির সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়; পরবর্তী সময়ে সরকার অনুমোদিত কাঠামোয় সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারিত হয়।

অবশেষে ২০১৫ সালের জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়। তৎকালীন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১০১ শতাংশ।

অর্থাৎ, ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে কর্মচারীদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে কমিশনের সুপারিশ আর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন—দুটি এক বিষয় নয়।

এবারও কি ‘পিঠা ভাগের’ মতো কমতে থাকবে?

এখানেই উঠে আসছে বহুল আলোচিত ‘বান্দরের পিঠা ভাগের’ উপমা।

একটি সুপারিশ করা হলো—তারপর সেটি আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পুনর্বিবেচনা করা হলো। এরপর সচিব কমিটি কাটছাঁট করল। পরবর্তী পর্যায়ে মন্ত্রিপরিষদ আবারও পরিবর্তন আনতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: মন্ত্রিপরিষদে আরও কাটছাঁট হবেই—এমন কোনো চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত এখনো নিশ্চিত নয়। তাই ১৫ হাজার, ১৬ হাজার ৫০০ বা ২০ হাজার—কোনটি শেষ পর্যন্ত সর্বনিম্ন বেসিক হবে, তা অনুমোদিত কাঠামো প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

নিম্নগ্রেডের কর্মচারীরাই কেন বেশি আলোচনায়?

নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হচ্ছে ১১ থেকে ২০তম গ্রেড। বর্তমান জাতীয় পে-স্কেলে এই গ্রেডগুলোতে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৮ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত।

প্রস্তাবিত কাঠামোতে নিম্নগ্রেডে তুলনামূলক বেশি শতাংশ বেতন বৃদ্ধির ধারণা সামনে এসেছে। কিন্তু ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির অঙ্কে সীমাবদ্ধ হলে ২০তম গ্রেডের ৮ হাজার ২৫০ টাকা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে কমিশনের প্রস্তাবিত ২০ হাজার টাকার তুলনায় পার্থক্য দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা মাসে, অর্থাৎ বছরে মূল বেতনের হিসাবে ৪২ হাজার টাকা

মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এই ব্যবধান কর্মচারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের আয়ের বড় অংশই দৈনন্দিন খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও পরিবারের মৌলিক ব্যয়ে চলে যায়। ফলে কাগজে বেতন দ্বিগুণ হলেও বাস্তব ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়বে—সেটিই মূল প্রশ্ন।

‘১০০ শতাংশ বৃদ্ধি’ শুনতে বড়, কিন্তু বাস্তবে কতটা?

এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব আছে।

বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে বেসিক হবে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ সংখ্যাগতভাবে বেতন দ্বিগুণের কাছাকাছি হলেও, জীবনযাত্রার ব্যয়ও যদি একই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধি সেই হারে নাও হতে পারে।

অন্যদিকে কমিশনের প্রস্তাবিত ২০ হাজার টাকা হলে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকার তুলনায় বৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ১৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ২০ হাজার টাকা এবং ১৬ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে পার্থক্যটি শুধু ৩ হাজার ৫০০ টাকা নয়; এটি নিম্নআয়ের কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার ভিত্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সর্বোচ্চ বেতন নিয়েও তৈরি হয়েছে ভিন্নতা

নতুন পে-স্কেলের সর্বোচ্চ বেতন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক সামনে এসেছে। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত করার প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে আগের পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার অঙ্কও আলোচনায় ছিল। ফলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ—দুই প্রান্তেই চূড়ান্ত অঙ্ক এখনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

এ কারণেই বর্তমানে ১৫ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মতো একটি সম্ভাব্য পরিসর নিয়ে আলোচনা থাকলেও এটিকে চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই

আসল পরীক্ষা হবে বেতন বৈষম্য কমানো

নবম পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি শুধু বেতন বাড়ানো নয়; বরং সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান কতটা যৌক্তিক করা যায়, সেটি।

২০১৫ সালের কাঠামোয় সর্বনিম্ন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা ছিল। নতুন কমিশন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত কমানোর লক্ষ্যেও সুপারিশ করেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

তাই নতুন কাঠামোয় নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হলে সেটি শুধু বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হবে না; বরং দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য কমানোর একটি নীতিগত পদক্ষেপও হতে পারে।

কর্মচারীদের প্রত্যাশা এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেল এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কমিশনের সুপারিশ, সচিব কমিটির পর্যালোচনা এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—এই তিনটি স্তরের পার্থক্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ

কমিশনের ২০ হাজার টাকার সুপারিশ থেকে যদি ১৬ হাজার ৫০০ টাকায় নেমে আসে, তাহলে কর্মচারীদের স্বাভাবিক প্রশ্ন হবে—পরবর্তী ধাপে আরও কমবে কি না। আবার সরকার যদি নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে কমিশনের কাছাকাছি অঙ্ক অনুমোদন করে, তাহলে সেটি হতে পারে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর।

তবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে ১৫ হাজার, ১৬ হাজার ৫০০, ২০ হাজার কিংবা ১ লাখ ২০ হাজার—কোনো অঙ্ককেই নিশ্চিত বেতন হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

তবু কর্মচারীদের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—পে কমিশন যদি পিঠার বড় টুকরো বানিয়ে দেয়, পর্যালোচনা আর কাটছাঁটের পর শেষ পর্যন্ত কর্মচারীর থালায় কতটুকু থাকবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে নবম পে-স্কেল সত্যিকার অর্থে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনবে, নাকি বহু প্রত্যাশার পরও সেটি হয়ে থাকবে আরেকটি ‘কাটছাঁটের পে-স্কেল’।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *