স্বর্ণ বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ ‘জিরো’ দেখানো যাবে না কেন? আয়কর আইন ২০২৩ কী বলছে
আয়কর রিটার্নে স্বর্ণ বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ ‘শূন্য (Zero)’ দেখানো যাবে কি না—এ নিয়ে করদাতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে অনেকেই মনে করেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বা বহু আগে কেনা স্বর্ণের কোনো ক্রয়মূল্য নেই, তাই মূলধনি আয়ও শূন্য হবে। তবে আয়কর আইন, ২০২৩ এবং পরবর্তী সংশোধনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ধারণা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
মূলধনি আয় কী?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৫৮ অনুযায়ী, কোনো পরিসম্পদ (Asset) বিক্রয় বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত বাজারে বিক্রয় বা হস্তান্তর মূল্য এবং অর্জন মূল্যের (Cost of Acquisition) পার্থক্যই মূলধনি আয় হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ লাভের হিসাব নির্ধারণের জন্য অর্জনমূল্য নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক।
উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে ‘জিরো’ কেন গ্রহণযোগ্য নয়?
আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার, দান, উইল, পারিবারিক বণ্টন বা অনুরূপ উপায়ে কোনো সম্পদ অর্জিত হলে সেই সম্পদের অর্জনমূল্য শূন্য ধরা হবে না।
বরং সম্পদের মালিকানা অর্জনের তারিখে ন্যায্য বাজারমূল্য (Fair Market Value)-কেই অর্জনমূল্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ফলে পরে সম্পত্তি বিক্রি করলে বিক্রয়মূল্য থেকে সেই ন্যায্য বাজারমূল্য বাদ দিয়ে মূলধনি লাভ নির্ধারণ করা হবে।
স্বর্ণের ক্ষেত্রেও একই নীতি
আয়কর আইনের বিশেষ তফসিলে ব্যক্তিগত স্বর্ণ, রৌপ্য, মূল্যবান ধাতু, রত্ন, চিত্রকর্ম, এন্টিকসহ বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি থেকে অর্জিত লাভকে মূলধনি আয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
অর্থাৎ স্বর্ণ বিক্রি করে লাভ হলে কেবল “কোনো ক্রয়মূল্য নেই” বলে পুরো অর্থকে শূন্য বা করমুক্ত দেখানোর সুযোগ নেই। অর্জনমূল্য নির্ধারণ করে তবেই লাভের হিসাব করতে হবে।
পাঁচ বছরের নিয়মও গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষ তফসিল অনুযায়ী—
- কোনো মূলধনি সম্পদ অর্জনের পাঁচ বছরের মধ্যে হস্তান্তর করলে, সেই লাভ মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বাভাবিক হারে করযোগ্য হতে পারে।
- পাঁচ বছর অতিক্রমের পর বিক্রি হলে নির্ধারিত হারে মূলধনি আয়কর প্রযোজ্য হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক করদাতা ভুলবশত উত্তরাধিকার সম্পত্তি বা স্বর্ণের অর্জনমূল্য ‘০’ লিখে দেন। এতে মূলধনি লাভের হিসাব বিকৃত হয় এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্পদের উৎস, মূল্য নির্ধারণ এবং কর গণনা পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।
তাই সম্পদের প্রকৃত অবস্থা অনুযায়ী—
- মালিকানা অর্জনের ভিত্তি,
- অর্জনের তারিখ,
- ন্যায্য বাজারমূল্য,
- বিক্রয়মূল্য এবং
- প্রয়োজনীয় দলিলপত্র
সংরক্ষণ করে আয়কর রিটার্ন দাখিল করাই নিরাপদ ও আইনসম্মত পদ্ধতি।
করদাতাদের জন্য করণীয়
কর বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী—
- উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে অর্জনের সময়কার ন্যায্য বাজারমূল্য নির্ধারণ করুন।
- স্বর্ণ বা মূল্যবান সম্পদের ক্ষেত্রে ক্রয়সংক্রান্ত দলিল বা মূল্য নির্ধারণের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
- রিটার্নে কোনো সম্পদের অর্জনমূল্য অযৌক্তিকভাবে ‘Zero’ দেখাবেন না।
- প্রয়োজন হলে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা কর পরামর্শকের সহায়তায় মূলধনি লাভের হিসাব প্রস্তুত করুন।
আইন অনুযায়ী, মূলধনি আয় নির্ধারণে অর্জনমূল্য একটি অপরিহার্য উপাদান। তাই উত্তরাধিকার সম্পত্তি বা স্বর্ণের ক্ষেত্রে ‘Zero’ দেখিয়ে কর হিসাব করা আইনসম্মত নয়; বরং আইন নির্ধারিত পদ্ধতিতে অর্জনমূল্য নির্ধারণ করে মূলধনি আয় গণনা করতে হবে।


