উচ্চতর গ্রেড কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে, নাকি আবেদন করতে হবে? নতুন পে-স্কেলে যা জানা জরুরি
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ কার্যকরের পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো একই পদে ৮ বছর পূর্তির পর উচ্চতর গ্রেড পেতে আবেদন করতে হবে কি না, নাকি এটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
প্রকাশিত জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর বিধান এবং সরকারি দপ্তরগুলোর প্রচলিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি কিছুটা পরিষ্কার হয়।
৮ বছর পূর্ণ হলেই প্রথম উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা
নতুন জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর উচ্চতর গ্রেড সংক্রান্ত বিধানে বলা হয়েছে, কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে ৮ বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে নবম বছরে ওই পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার যোগ্য হবেন।
অর্থাৎ নতুন নিয়মে প্রথম উচ্চতর গ্রেডের জন্য আগের ১০ বছরের পরিবর্তে ৮ বছর সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চতর গ্রেড পাওয়া পদোন্নতি হিসেবে গণ্য হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘স্বয়ংক্রিয়’ শব্দটির অর্থ আবেদন বা অফিসের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজে নিজে বেতন পরিবর্তন হয়ে যাওয়া নয়।
তাহলে আবেদন করতে হবে কি?
এখানেই মূল বিষয়টি।
২০১৫ সালের উচ্চতর গ্রেড সংক্রান্ত অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যায় ‘স্বয়ংক্রিয়’ বলতে বোঝানো হয়েছিল—এটি ডিপিসির মাধ্যমে পদোন্নতি নয়; প্রয়োজনীয় অনুমোদন গ্রহণ করে অফিস আদেশ জারির মাধ্যমে উচ্চতর গ্রেডের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে।
বর্তমান সরকারি দপ্তরগুলোর নাগরিক সনদেও উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই এবং অনুমোদনের পর অফিস আদেশ জারির প্রক্রিয়া দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ সমবায় একাডেমির সিটিজেন চার্টারে উচ্চতর গ্রেডের জন্য আবেদন, কর্তৃপক্ষের সুপারিশ, বিভাগীয় মামলা নেই—এ মর্মে প্রত্যয়ন, চাকরি সন্তোষজনক হওয়ার প্রত্যয়ন, নিয়োগপত্র ও যোগদানপত্রের কপি চাওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ বিষয়টি দুইভাবে বুঝতে হবে—
যোগ্যতা অর্জন = বিধি অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় অধিকার সৃষ্টি
কিন্তু
বেতন বাস্তবায়ন = কর্তৃপক্ষের যাচাই, অনুমোদন ও অফিস আদেশের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম।
তাই বাস্তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তর আবেদন চাইলেও সেটিকে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জন্য নতুন করে ‘পদোন্নতির আবেদন’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ছবিতে থাকা আবেদনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আপনার দেওয়া ছবিতে একজন পুলিশ সদস্য কর্তৃপক্ষের কাছে উচ্চতর গ্রেডের আবেদন করেছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, তিনি একই পদে ৮ বছর পূর্ণ করেছেন এবং জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন।
এ ধরনের আবেদন বাস্তবে যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য যাচাই ও অফিস আদেশ জারির প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।
অর্থাৎ আবেদন করলেই উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যাবে—এমন নয়; আবার আবেদন না করলেও শুধু ৮ বছর পূর্ণ হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বেতন নিজে নিজে সিস্টেমে পরিবর্তিত হয়ে যাবে—এমনটিও ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
প্রথমে দেখতে হবে—
- একই পদে ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে কি না;
- কর্মচারী স্থায়ী কি না;
- চাকরি সন্তোষজনক কি না;
- এর আগে উচ্চতর গ্রেড/টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড পেয়েছেন কি না;
- পদোন্নতি হয়েছে কি না;
- নতুন বিধানের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা প্রযোজ্য কি না;
- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ও অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে কি না।
১ জুলাই ২০২৬-এর আগে ৮ বছর পূর্ণ হলে কী হবে?
নতুন ব্যবস্থায় এ বিষয়েও বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। যেসব স্থায়ী কর্মচারীর ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে একই পদে ৮ বছর পূর্ণ হয়েছে কিন্তু ১০ বছর পূর্ণ হয়নি, তাদের ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে প্রকাশিত গেজেটের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থাকা কর্মচারীদের একটি অংশ নতুন ব্যবস্থায় তুলনামূলক দ্রুত উচ্চতর গ্রেডের আওতায় আসতে পারেন।
দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রেও রয়েছে সময়সীমা
প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ৬ বছর চাকরি পূর্ণ হলে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন সরকারি তথ্যসূত্রে প্রচলিত বিধানেও প্রথম উচ্চতর গ্রেডের পরবর্তী ৬ বছর পূর্তির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
তবে কারও পূর্ববর্তী টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের ইতিহাস থাকলে হিসাবটি সরলভাবে শুধু বর্তমান চাকরির বয়স দিয়ে করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পুরো চাকরি-রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
‘কর্তার ইচ্ছা’—এই অভিযোগের বাস্তবতা কী?
অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, উচ্চতর গ্রেডের জন্য যোগ্যতা অর্জনের পরও বছরের পর বছর অফিস আদেশ না হওয়ায় তারা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। আবার কোথাও আবেদন নেওয়া হচ্ছে, কোথাও দপ্তর নিজ উদ্যোগে তালিকা তৈরি করছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
অন্যদিকে কে যোগ্য, তার চাকরির মেয়াদ কত, পূর্বে কী সুবিধা পেয়েছেন এবং চাকরি সন্তোষজনক কি না—এসব যাচাই প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাজ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন চার্টারেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টাইমস্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর স্কেল সংক্রান্ত মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে চাকরিতে প্রথম যোগদানের প্রমাণক এবং পূর্বে টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতার তারিখসংক্রান্ত আদেশের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তাই দীর্ঘদিন ফাইল আটকে থাকলে সেটিকে সরাসরি ‘উচ্চতর গ্রেডের নিয়ম নেই’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং প্রশাসনিক নিষ্পত্তির বিলম্ব এবং বিধিগত যোগ্যতা—দুটি আলাদা বিষয়।
আবেদন করলে কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?
দপ্তরভেদে কাগজপত্রের তালিকা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে সরকারি দপ্তরের প্রকাশিত সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে—
- নির্ধারিত/সাদা কাগজে আবেদন;
- নিয়োগপত্রের কপি;
- যোগদানপত্রের কপি;
- চাকরির ধারাবাহিকতার প্রমাণ;
- কর্তৃপক্ষের সুপারিশ;
- বিভাগীয় মামলা নেই—এ মর্মে প্রত্যয়ন;
- চাকরি সন্তোষজনক—এ মর্মে প্রত্যয়ন;
- পূর্বে উচ্চতর গ্রেড/টাইমস্কেল/সিলেকশন গ্রেড পেয়ে থাকলে তার আদেশের কপি।
তবে নিজ নিজ দপ্তর বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ যে কাগজপত্র চায়, সেটিই চূড়ান্তভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: আবেদন না করলে কি অধিকার চলে যাবে?
শুধু আবেদন না করার কারণে বিধিতে যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মচারীর বিধিগত প্রাপ্যতা বাতিল হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে সরাসরি পৌঁছানো ঠিক নয়। কারণ নতুন বিধানে উচ্চতর গ্রেডকে যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
তবে বাস্তব প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আবেদন/তথ্য প্রদান না করলে ফাইল শনাক্ত, যাচাই ও অফিস আদেশ জারি বিলম্বিত হতে পারে।
তাই যোগ্য কর্মচারীদের জন্য বাস্তবসম্মত করণীয় হলো—
নিজের যোগ্যতার তারিখ যাচাই করে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী/নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন বা প্রয়োজনীয় তথ্য দাখিল করা এবং অফিস আদেশ জারির বিষয়টি অনুসরণ করা।
এতে একদিকে বিধিগত অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে, অন্যদিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
সারকথা
জাতীয় বেতন স্কেল–২০২৬ অনুযায়ী ৮ বছর পূর্ণ করলেই উচ্চতর গ্রেডের যোগ্যতা সৃষ্টি হবে—এটি ‘স্বয়ংক্রিয়’ সুবিধা। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কোনো যাচাই, অনুমোদন বা অফিস আদেশ ছাড়াই বেতন নিজে নিজে পরিবর্তিত হবে।
তাই বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাখ্যা হলো:
৮ বছর পূর্তি → যোগ্যতা সৃষ্টি → কর্তৃপক্ষের যাচাই → প্রয়োজনীয় অনুমোদন → অফিস আদেশ → উচ্চতর গ্রেডে বেতন নির্ধারণ।
আর কোনো দপ্তর যদি উচ্চতর গ্রেডের জন্য আবেদন আহ্বান করে, তাহলে যোগ্য কর্মচারীর কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করা উচিত, তবে এটিকে পদোন্নতির আবেদন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। ২০১৬ সালের অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যাতেও ‘স্বয়ংক্রিয়’ উচ্চতর গ্রেডকে ডিপিসির পদোন্নতি থেকে পৃথক করে অনুমোদন ও অফিস আদেশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছিল।
বিশেষ করে ছবিতে দেখা পুলিশ সদস্যদের আবেদনের ক্ষেত্রে: আবেদনটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা তৈরির জন্য নয়; বরং যোগ্যতা যাচাই ও প্রশাসনিকভাবে সুবিধাটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। তবে সংশ্লিষ্ট বাহিনী/দপ্তর যদি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও ফরম্যাটে আবেদন চেয়ে থাকে, তা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।


