৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকার বেতন কাটছাঁট না করার দাবি, দ্রুত পে-স্কেল গেজেট চায় কল্যাণ সমিতি

নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে নতুন করে সরব হয়ে উঠেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সচিব কমিটির সুপারিশ করা সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতন থেকে আর কোনো ধরনের কাটছাঁট করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। একই সঙ্গে বর্তমান বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বনিম্ন বেতন আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

শনিবার (১৫ আগস্ট) সংগঠনের সভাপতি আব্দুল মালেক ও মহাসচিব আশিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে দ্রুত নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির আহ্বানও জানানো হয়েছে।

২০ হাজার টাকার নিচে নামলে আপত্তি

সংগঠনটির দাবি, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সচিব কমিটি নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু বর্তমান সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করলেও তা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। সংগঠনটির মতে, এই হিসাব বর্তমান বাস্তবতার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

তাদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে নতুন পে স্কেল না থাকায় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। ফলে শুধু শতাংশের হিসাবে বেতন বৃদ্ধি না করে বাস্তব বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে একটি যৌক্তিক সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এ কারণেই কর্মচারী সংগঠনটি ২০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতনের সুপারিশকে কোনোভাবেই কমিয়ে না দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। বরং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই অঙ্ক আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে তারা।

আগের পে স্কেলের তুলনা টেনে অসন্তোষ

বিবৃতিতে অতীতের বেতন কাঠামোর বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, আগের বিভিন্ন পে স্কেলে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের জন্য ১৪০ শতাংশ বা তারও বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ বাস্তবায়নের নজির রয়েছে।

সেই তুলনায় এবার নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের জন্য প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধিকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।

সংগঠনটির যুক্তি, দীর্ঘ সময় পর নতুন পে স্কেল আসার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যমান বেতনের ওপর নির্দিষ্ট শতাংশ যোগ করলেই হবে না। গত এক দশকে দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা ব্যয়, পরিবহন খরচসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা বেড়েছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

‘বেতন বাড়ার আগেই বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়’

বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘ ১১ বছর পর বহু আন্দোলন-সংগ্রাম ও ধারাবাহিক দাবির পর নবম পে স্কেল নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বড় হচ্ছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, বেতন বাড়ার আগেই বাজারে পণ্য ও সেবার দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধি বাস্তব জীবনযাত্রার চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।

ফলে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের সময় শুধু সরকারি কোষাগারের ব্যয়ের বিষয়টি নয়, কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।

৩৫ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার—কেন ক্ষোভ?

কল্যাণ সমিতির বিবৃতিতে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর মতবিনিময় সভার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কর্মচারীদের বর্তমান আর্থিক অবস্থা এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে আয়ের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি তুলে ধরে দুটি পে স্কেলের সমন্বয়ের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছিল বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।

কিন্তু সেই দাবির তুলনায় অনেক কমিয়ে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বেতনের সুপারিশ করা হয়েছে—এমন দাবি করে সংগঠনটি বলছে, ৩৫ হাজার টাকার প্রত্যাশা থেকে ২০ হাজার টাকায় নেমে আসা কর্মচারীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা তৈরি করছে।

তাদের মতে, দীর্ঘ সময়ের বেতন কাঠামোর ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির বাস্তবতা বিবেচনা করলে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার নিচে নামানো হলে নতুন পে স্কেলের মূল উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যাহত হবে।

সর্বোচ্চ বেতন নিয়েও প্রশ্ন

নবম জাতীয় পে স্কেলের সম্ভাব্য বেতন কাঠামো নিয়ে বৈষম্যের প্রশ্নও তুলেছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১:৪ অনুপাতে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা করার কথা থাকলেও তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

সংগঠনটির অভিযোগ, সর্বোচ্চ বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে যদি সংশোধন করা সম্ভব হয়, তাহলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একইভাবে বাস্তবসম্মত সমন্বয় করা প্রয়োজন। অন্যথায় নতুন বেতন কাঠামোয় বেতন বৈষম্যের নতুন স্তর তৈরি হতে পারে।

‘২০ হাজারের নিচে নামলে অস্থিরতা বাড়বে’

সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা থেকেও কমিয়ে দেওয়া হলে কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি।

সংগঠনটির ভাষ্য, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের আয় মূলত নির্দিষ্ট বেতনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের অতিরিক্ত আয় বা সঞ্চয়ের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের সংসারে।

এ অবস্থায় নতুন পে স্কেলে প্রত্যাশার তুলনায় কম বেতন নির্ধারণ করা হলে কর্মচারীদের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ না হলে কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা ও হতাশা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

দ্রুত গেজেট প্রকাশের দাবি

সংগঠনটির নেতারা সচিব কমিটি ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার চেয়ে আরও কিছুটা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বাজারমূল্য ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে স্কেলের অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সামনে মূল প্রশ্ন—কত হবে সর্বনিম্ন বেতন?

নবম জাতীয় পে স্কেল ঘিরে এখন সরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার জায়গাগুলোর একটি হলো সর্বনিম্ন মূল বেতন। একদিকে কর্মচারী সংগঠনগুলো ৩৫ হাজার টাকা বা তার কাছাকাছি একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামোর দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সচিব কমিটির সুপারিশে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার কথা উঠে এসেছে।

এই ২০ হাজার টাকাও যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে নতুন পে স্কেল নিয়ে কর্মচারীদের অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে—এমন বার্তাই দিয়েছে কল্যাণ সমিতি।

ফলে নবম জাতীয় পে স্কেলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সর্বনিম্ন বেতন কত নির্ধারণ করা হচ্ছে, সর্বোচ্চ বেতনের সঙ্গে অনুপাত কী রাখা হচ্ছে এবং দ্রব্যমূল্যের বাস্তবতার সঙ্গে নতুন কাঠামোর সামঞ্জস্য কতটা থাকছে—এসব বিষয়ই এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজরের কেন্দ্রে রয়েছে।

কল্যাণ সমিতির দাবি, নতুন পে স্কেল শুধু বেতন বৃদ্ধির একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তাই সর্বনিম্ন বেতন কমানোর পরিবর্তে বরং তা আরও বাড়িয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা উচিত।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *