এনআইডির জন্মতারিখ সংশোধনে নতুন নিয়ম, উপজেলা নির্বাচন অফিসেই হবে নিষ্পত্তি
জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) জন্মতারিখ বা বয়স সংশোধনের প্রক্রিয়া আরও সহজ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন থেকে অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, এসএসসি/মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন মাঠপর্যায়েই নিষ্পত্তি করা যাবে। ফলে এ ধরনের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য সব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না।
নতুন এই নির্দেশনা দিয়ে ১৩ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশনস) মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। পরিপত্রে সংশোধন কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি আবেদন যাচাই, অনুমোদন ও বাতিলের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যেসব জন্মতারিখ সংশোধন মাঠপর্যায়েই করা যাবে
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইনে যাচাই করা যায়—এমন জেএসসি/মাধ্যমিক/সমমানের শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরির আবেদন হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ধরনের আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে—
- সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন কর্মকর্তা;
- সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা;
- এনআইডি উইংয়ের সহকারী পরিচালক;
- উপপরিচালক এবং
- পরিচালক (অপারেশনস) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের।
অর্থাৎ, বৈধ ও অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদ দিয়ে জন্মতারিখের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে আগের মতো কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে আবেদন নিষ্পত্তি করতে পারবেন।
শুধু শিক্ষা সনদ থাকলেই হবে না
তবে নতুন নিয়মের অর্থ এই নয় যে, শিক্ষা সনদ দেখালেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনআইডির জন্মতারিখ পরিবর্তন হয়ে যাবে।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষা সনদের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রমাণপত্র ও দলিলাদি গ্রহণ এবং যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ সংশোধনের আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দেওয়া তথ্য ও দলিল যথাযথভাবে যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অনুমোদন বা বাতিলের কারণ CMS-এ লিখতে হবে
নতুন নির্দেশনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো সংশোধনের আবেদন ইলেকট্রনিকভাবে অনুমোদন বা বাতিল করার সময় কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS)-এ বাধ্যতামূলকভাবে নোট দিতে হবে।
এর ফলে কোন আবেদন কেন অনুমোদন করা হলো বা কেন বাতিল করা হলো, তার একটি ডিজিটাল রেকর্ড থাকবে। এতে ভবিষ্যতে কোনো আবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ যাচাই করা সহজ হবে এবং সংশোধন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা বাড়বে।
কর্মকর্তাদের কাজও নিয়মিত মনিটরিং হবে
শুধু ক্ষমতা দেওয়াই নয়, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কীভাবে এসব আবেদন নিষ্পত্তি করছেন, সেটিও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা তাঁদের অধীন কর্মকর্তাদের সম্পাদিত কার্যক্রম মনিটর করবেন। দৈবচয়নের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রতিটি নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার অন্তত তিনটি আবেদন যাচাই করার কথা বলা হয়েছে।
যাচাই শেষে নির্ধারিত ছকে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে তা পরিচালক (অপারেশন্স)-এর ইন্টারনাল অ্যাকাউন্টে পাঠানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সব ধরনের জন্মতারিখ সংশোধন উপজেলা পর্যায়ে নয়
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নিয়মে সব ধরনের জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষমতা উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসকে দেওয়া হয়নি।
পরিপত্র অনুযায়ী, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অনুসারে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য থাকবে।
একইভাবে, জন্মতারিখের সঙ্গে নিজের নাম এবং বাবা-মায়ের নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তন সংক্রান্ত আবেদনও মহাপরিচালক পর্যায়ে নিষ্পত্তি হবে।
অর্থাৎ, সহজীকরণের আওতায় মূলত অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষা সনদভিত্তিক জন্মতারিখ সংশোধনকে মাঠপর্যায়ে আনা হয়েছে; জটিল বা বড় ধরনের তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের যাচাই বহাল থাকছে।
একই তথ্য দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ নেই
নতুন নির্দেশনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার একটি হলো একই ফিল্ডে দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ না থাকা।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, জন্মতারিখ, নিজের নাম এবং বাবা-মায়ের নামের সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একবার সংশোধন করা হলে একই ফিল্ডে দ্বিতীয়বার সংশোধন করা যাবে না।
ফলে আবেদন করার আগে জন্মতারিখ ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র ভালোভাবে যাচাই করে আবেদন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তথ্য দিয়ে একবার সংশোধন সম্পন্ন হয়ে গেলে পরবর্তীতে একই তথ্য আবার পরিবর্তনের সুযোগ না থাকার কারণে আবেদনকারীদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
নাগরিকদের জন্য কী পরিবর্তন হলো
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমার সম্ভাবনা। আগে শিক্ষা সনদভিত্তিক জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিষ্পত্তির প্রয়োজন হলে আবেদনকারীর অপেক্ষার সময় বাড়তে পারত। এখন নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী আবেদন উপজেলা/থানা ও জেলা পর্যায়ের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিষ্পত্তি করতে পারবেন।
বিশেষ করে যাদের এনআইডিতে জন্মতারিখের সঙ্গে শিক্ষা সনদের তথ্যের অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং যাদের শিক্ষা সনদ অনলাইনে যাচাইযোগ্য, তাদের জন্য নতুন নির্দেশনাটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আবেদনকারীদের মনে রাখতে হবে, শুধু আবেদন করলেই সংশোধন নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা সনদ অনলাইনে যাচাইযোগ্য হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রমাণপত্রও নির্বাচন কমিশনের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা হবে।
কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ
জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্মতারিখ সরকারি চাকরি, পাসপোর্ট, ব্যাংকিং, কর-সংক্রান্ত কার্যক্রম, শিক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি সেবায় গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়-তথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এনআইডি ও শিক্ষা সনদে জন্মতারিখের অসামঞ্জস্য থাকলে নাগরিকদের নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়।
নতুন নির্দেশনায় নির্ভরযোগ্য ও অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষা সনদের ভিত্তিতে সংশোধনের ক্ষমতা মাঠপর্যায়ে দেওয়ার ফলে একদিকে যেমন সেবা গ্রহণের সময় কমতে পারে, অন্যদিকে ডিজিটাল যাচাই ও CMS-এ বাধ্যতামূলক নোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের নতুন পরিপত্রকে এনআইডি সংশোধন সেবাকে নাগরিকের কাছাকাছি নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সহজীকরণের পাশাপাশি দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ না থাকায় আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য ও যথাযথ প্রমাণপত্র দিয়ে আবেদন করার বিষয়টিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


