জাতীয় পরিচয়পত্র । জন্ম নিবন্ধন

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য: সিরাজগঞ্জের ডিপিও সাহাব উদ্দিনকে ‘তিরস্কার’ দণ্ড

ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ডিপিও) জনাব মোঃ সাহাব উদ্দিনকে ‘তিরস্কার’ সূচক লঘুদণ্ড প্রদান করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। রোববার (১২ এপ্রিল) মন্ত্রণালয়ের তদন্ত ও শৃঙ্খলা শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তির কথা জানানো হয়।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

প্রজ্ঞাপন সূত্রে জানা যায়, জনাব মোঃ সাহাব উদ্দিন যখন টাঙ্গাইল জেলায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন ভোটার তালিকা হালনাগাদ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করেন। তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়।

তদন্ত ও শুনানি

অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা লিখিত জবাব দাখিল করেন এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। শুনানি চলাকালে তিনি দায় স্বীকার করে নিয়ে জানান যে, ভবিষ্যতে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সরকারের প্রতি অনুগত থেকে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সাথে তিনি তার অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

তিনি আবেদনে উল্লেখ করেন যে, আগামী অক্টোবর ২০২৭ সালে তিনি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) গমন করবেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে তিনি এই বিভাগীয় মামলার দায় হতে অব্যাহতির অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

তদন্ত প্রতিবেদন এবং দাখিলকৃত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে আনীত ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে তার ক্ষমা প্রার্থনা এবং অবসরের বিষয়টি বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ তাকে বড় কোনো শাস্তির বদলে অপেক্ষাকৃত নমনীয় দণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়:

“অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিক সকল বিষয় বিবেচনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৪(২)(ক) অনুযায়ী তাকে ‘তিরস্কার’ সূচক লঘুদণ্ড প্রদান করা হলো।”

প্রজ্ঞাপন জারি

মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মোঃ মাসুদ রানা স্বাক্ষরিত এই আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে আদেশের অনুলিপি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় উপ-পরিচালক এবং জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলায় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। সরকারি চাকরিতে ‘তিরস্কার’ একটি দণ্ড হিসেবে গণ্য হয়, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সার্ভিস বুকে রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) তে কি আছে?

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা। এই বিধিতে মূলত “অসদাচরণ” (Misconduct)-এর সংজ্ঞা এবং এর আওতাভুক্ত বিষয়গুলো নির্ধারণ করা হয়েছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, বিধি ৩(খ) অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারীর আচরণ যদি শৃঙ্খলা বা শিষ্টাচার বহির্ভূত হয়, তবে তাকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে।

নিচে ৩(খ) বিধিতে বর্ণিত বিষয়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. ‘অসদাচরণ’ বলতে কী বোঝায়?

বিধি ৩(খ) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী যদি নিম্নলিখিত কাজগুলো করেন, তবে তিনি অসদাচরণের দায়ে অভিযুক্ত হবেন:

  • আইন ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী কাজ: সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য কোনো আইন, বিধি বা সরকারি আদেশ লঙ্ঘন করা।

  • কর্তব্যে অবহেলা: অর্পিত দায়িত্ব পালনে অনীহা বা অবহেলা প্রদর্শন করা।

  • উদ্ধত আচরণ: ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনানুগ আদেশ অমান্য করা বা উদ্ধত আচরণ প্রদর্শন করা।

  • অনৈতিক কাজ: কোনো কর্মচারীর এমন কোনো আচরণ যা সরকারি কর্মচারীর জন্য অশোভন বা দুর্নীতিমূলক।

  • ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করা: সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা অন্য কারো জন্য অন্যায্য সুবিধা গ্রহণ করা।

  • প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি: এমন কোনো কাজ করা যাতে সরকারের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়।

২. কেন এই বিধিটি গুরুত্বপূর্ণ?

আপনি যে প্রজ্ঞাপনটি শেয়ার করেছিলেন, সেখানেও কিন্তু জনাব সাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে এই বিধি ৩(খ) মোতাবেক ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ আনা হয়েছে। কারণ তিনি ভোটার তালিকা নিয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন যা একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য অশোভন বা সরকারি শৃঙ্খলার পরিপন্থী ছিল।

৩. শাস্তির বিধান

যদি ৩(খ) এর অধীনে কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদাচরণ প্রমাণিত হয়, তবে বিধিমালা অনুযায়ী তাকে দুই ধরনের দণ্ড দেওয়া হতে পারে:

১. লঘুদণ্ড (Minor Penalties): যেমন- তিরস্কার, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা ইত্যাদি। (আপনার শেয়ার করা ঘটনায় ‘তিরস্কার’ লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে)। ২. গুরুদণ্ড (Major Penalties): যেমন- পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি হতে অপসারণ বা বরখাস্ত।

সংক্ষেপে, বিধি ৩(খ) হলো এমন একটি আইনি কাঠামো যা নিশ্চিত করে যে একজন সরকারি কর্মচারী যেন সবসময় পেশাদারিত্ব এবং সরকারি নিয়ম মেনে চলেন।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *