সরকারি চাকুরিতে আধুনিকায়ন: এক যুগ পরেও বাস্তবায়ন সংকটে পদনাম পরিবর্তন
সরকারি অফিসের কাজের গতিশীলতা ও পরিবেশের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৪ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার করা হয় । তৎকালীন সময়ে প্রচলিত অনেক পদনামকে ‘পুরানো দিনের’ ও ‘অমর্যাদাকর’ হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলোকে সময়োপযোগী করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার । তবে পরিপত্র জারির এক যুগ পেরিয়ে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে এখনো সেই পুরনো প্রথার রেশ রয়ে গেছে, যা প্রশাসনিক আধুনিকায়নের পথে অন্তরায়।
ঐতিহাসিক সেই পরিপত্র ও পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট
২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি (২২ মাঘ, ১৪২০ বঙ্গাব্দ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সওব্য-২ শাখা থেকে একটি বিশেষ পরিপত্র জারি করা হয় । তৎকালীন সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান সিকদার স্বাক্ষরিত এই আদেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর এবং এমনকি রাষ্ট্রপতির ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত কর্মচারীদের পদবি পরিবর্তনের নির্দেশনা দেওয়া হয় ।
পদনাম পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ছিল:
-
পুরানো দিনের সেকেলে পদনামগুলো বর্জন করা ।
-
কর্মচারীদের পদের নামগুলোকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করা ।
-
কর্মক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের মর্যাদা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা।
উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তিত পদনাম
পরিপত্র অনুযায়ী, মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত কয়েক ডজন পদের নাম পরিবর্তন করা হয়। প্রধান কিছু পরিবর্তন নিচে তুলে ধরা হলো:
| পদের বর্তমান (পুরনো) নাম | পরিবর্তিত (নতুন) পদনাম |
| এমএলএসএস/দপ্তরী/পিয়ন/চাপরাশি |
অফিস সহায়ক |
| সুইপার/ঝাড়ুদার/ক্লিনার/ফরাস |
পরিচ্ছন্নতা কর্মী |
| গার্ড/নাইট গার্ড/প্রহরী/দারোয়ান/চৌকিদার |
নিরাপত্তা প্রহরী |
| মেসেঞ্জার/সাইকেল মেসেঞ্জার |
বার্তা বাহক |
| মশালচি |
সহকারি বাবুর্চি |
| খিদমতগার |
পরিচর্যাকারী |
| বেবী টেক্সী ড্রাইভার |
ড্রাইভার |
শর্তাবলী ও আইনি ভিত্তি
সরকার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল যে, এই পদবি পরিবর্তনের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের কার্যপরিধি, পদমর্যাদা বা বেতন-ভাতার কোনো পরিবর্তন হবে না । যেহেতু এতে কোনো বাড়তি আর্থিক সংশ্লেষ ছিল না, তাই অর্থ বিভাগের আলাদা সম্মতির প্রয়োজন পড়েনি । আদেশ জারির তারিখ থেকেই এটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ।
বাস্তবায়নে ধীরগতি ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
দুঃখজনক বিষয় হলো, এক যুগ পার হয়ে গেলেও দেশের অনেক স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, দপ্তর এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ের অফিসগুলোতে এখনো ‘পিয়ন’, ‘চাপরাশি’ বা ‘ঝাড়ুদার’ শব্দগুলোর ব্যবহার দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:
-
মানসিকতার পরিবর্তন: দীর্ঘদিনের প্রচলিত শব্দগুলো ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া।
-
নথিপত্রে হালনাগাদ না হওয়া: অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বিধিমালা বা সার্ভিস রুলস দ্রুত সংশোধন না করা।
-
তদারকির অভাব: সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এই পরিপত্রের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে কি না, তা নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং না থাকা।
উপসংহার
সরকারি সেবা প্রদানকারী কর্মচারীদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য পদনামের আধুনিকায়ন ছিল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল দাপ্তরিক কাজে এবং জনসমক্ষে নতুন পদবিগুলো ব্যবহার করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, বরং একটি আধুনিক ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রকাঠামো গড়ার অন্যতম শর্ত।



