নৈমিত্তিক । অর্জিত । মাতৃত্বকালীন

ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট লিভ ২০২৬ । বাংলাদেশে ছুটির আড়ালে লুকানো বৈষম্য ও বাস্তবতা কি?

বাংলাদেশে সরকারি বিধিমালা (বিশেষ করে ‘BSR’ বা বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস) অনুযায়ী, যে সকল প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাজের অবসরে দীর্ঘমেয়াদী অবকাশ বা ছুটি (Vacation) প্রদান করা হয় এবং সেই ছুটির সময়েও কর্মচারীরা বেতন পান, সেগুলোকে ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট বা ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠান বলা হয়।

বাংলাদেশে মূলত নিচের প্রতিষ্ঠানগুলো এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত:


১. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (সবচেয়ে সাধারণ উদাহরণ)

বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি ও সরকার অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট হিসেবে বিবেচিত।

  • সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়: গ্রীষ্মকালীন ছুটি, রমজানের ছুটি এবং শীতকালীন ছুটির মতো দীর্ঘ অবকাশ পান শিক্ষকরা।

  • সরকারি কলেজ: উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের কলেজসমূহ।

  • পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: যেসব প্রতিষ্ঠানে সেমিস্টার ব্রেক বা নির্দিষ্ট বার্ষিক ছুটি থাকে।

২. বিচার বিভাগ (Judiciary)

আদালতগুলো বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠান।

  • সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ): প্রতি বছর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট দীর্ঘ মেয়াদী অবকাশ যাপন করেন বিচারপতিরা।

  • অধস্তন আদালত (Lower Courts): জেলা জজ আদালতগুলোতেও নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত ডিসেম্বর মাসে) সিভিল ভ্যাকেশন থাকে।

৩. বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান

কিছু নির্দিষ্ট একাডেমি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যেখানে কোর্সের মাঝে দীর্ঘ বিরতি থাকে, সেগুলোকে শর্তসাপেক্ষে এই তালিকায় ধরা হয়। তবে এটি নির্ভর করে তাদের নিজস্ব সার্ভিস রুলসের ওপর।


ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য বিশেষ নিয়ম

এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরতদের ক্ষেত্রে ছুটির হিসাব সাধারণ সরকারি অফিসের তুলনায় ভিন্ন হয়:

বিষয়নিয়ম
অর্জিত ছুটি (Earned Leave)ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের কর্মীরা পূর্ণ গড় বেতনে ছুটি কম পান (সাধারণত বছরে ১৫ দিন), কারণ তারা দীর্ঘ অবকাশ ভোগ করেন।
ডিউটি ডিউরিং ভ্যাকেশনযদি কোনো কর্মীকে ছুটির সময়েও কাজ করতে বাধ্য করা হয়, তবে তিনি বিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত ছুটির পাওনাদার হন।

একটি সাধারণ ভুল ধারণা

অনেকে মনে করেন সব সরকারি অফিস ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহায় ছুটি পায় বলে সেগুলোও ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠান। আসলে তা নয়। সাধারণ অফিসগুলো ‘Non-Vacation Department’। কেবল যাদের বার্ষিক ক্যালেন্ডারে দীর্ঘমেয়াদী ‘Vacation’ বা ‘অবকাশ’ বরাদ্দ থাকে (যেমন আদালত বা স্কুল), তারাই এই তালিকায় পড়ে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মজীবীদের কাজের ধরন ও ছুটির কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দপ্তরগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে: নন-ভ্যাকেশন এবং ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট। অধিকাংশ সরকারি দপ্তর নন-ভ্যাকেশন হলেও শিক্ষা এবং বিচার বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো ‘ভ্যাকেশন’ বা ‘অবকাশ’ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। বাইরে থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের ছুটি আকর্ষণীয় মনে হলেও, চাকরি শেষে এর প্রভাব পড়ছে কর্মকর্তাদের পেনশনে।

কোনগুলো ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠান?

বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (BSR) অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিরতিতে দীর্ঘমেয়াদী অবকাশ (যেমন—গ্রীষ্মকালীন ছুটি, শীতকালীন ছুটি বা রমজানের ছুটি) পালিত হয়, সেগুলোই ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট।

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: দেশের সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই তালিকার শীর্ষে। এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর্যন্ত বার্ষিক অবকাশ থাকে।

  • বিচার বিভাগ (Judiciary): সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) এবং অধস্তন দেওয়ানি আদালতগুলো ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে দেওয়ানি আদালতগুলোতে দীর্ঘ অবকাশ থাকে, যদিও এ সময় জরুরি কাজ পরিচালনার জন্য ‘ভ্যাকেশন জজ’ নিয়োগ করা হয়।

  • বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: কিছু সরকারি প্রশিক্ষণ একাডেমি যেখানে নির্দিষ্ট সেশন শেষে দীর্ঘ বিরতি থাকে, সেগুলোকেও এই তালিকায় ধরা হয়।


ভ্যাকেশন বনাম নন-ভ্যাকেশন: বৈষম্য কোথায়?

অনেকের ধারণা, ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের কর্মীরা বেশি ছুটি পান। কিন্তু বিধিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা দীর্ঘ অবকাশ পেলেও আর্থিক দিক থেকে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হন:

তুলনার বিষয়নন-ভ্যাকেশন (সাধারণ অফিস)ভ্যাকেশন (স্কুল/আদালত)
অর্জিত ছুটি (Earned Leave)প্রতি ১১ দিনে ১ দিন (বছরে ৩৩ দিন)।বছরে মাত্র ১৫ দিন (গড় বেতনে)।
ছুটি নগদায়ন (লাম্পগ্রান্ট)অবসরের সময় ১৮ মাসের মূল বেতন পান।অর্জিত ছুটি কম থাকায় মাত্র ৮.৫ মাসের বেতন পান।
পিআরএল (PRL) সুবিধাপূর্ণ বেতনে এক বছরের ছুটি।অর্ধ-গড় বেতনে ছুটি কাটাতে হয়।
আর্থিক ব্যবধানঅবসরকালীন সুবিধা তুলনামূলক অনেক বেশি।চাকরি শেষে প্রায় ১০-১৫ লক্ষ টাকার আর্থিক ঘাটতি হতে পারে।

কর্মকর্তাদের দাবি: ‘নন-ভ্যাকেশন’ মর্যাদা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘নন-ভ্যাকেশন’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি তুলছেন। তাদের মতে, ছুটির সময়েও তাদের উপবৃত্তি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ বা পাবলিক পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে তারা প্রকৃত ‘অবকাশ’ ভোগ করতে পারছেন না, অথচ অর্জিত ছুটি ও পেনশনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিশেষ নিয়ম: ভ্যাকেশনে কাজ করলে কী হবে?

যদি কোনো ভ্যাকেশন প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে ছুটির সময়েও দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত রাখা হয়, তবে তিনি বিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুপাতে অতিরিক্ত অর্জিত ছুটি (Earned Leave) দাবি করতে পারেন। বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও অবকাশকালীন বিচারকদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা থাকে।

উপসংহার

ভ্যাকেশন ব্যবস্থাটি ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে মূলত শিক্ষা ও বিচারিক কাজের ধকল কাটানোর জন্য। তবে বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সময়ে এই পদ্ধতির কারণে পেনশন ও অর্জিত ছুটিতে যে বিশাল পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, তা নিরসনে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *