১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল: তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত, সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা
দেশের প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল)। তবে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় রেখে এই নতুন বেতন কাঠামো একযোগে নয়, বরং তিন ধাপে তিন অর্থবছরে মাঠপর্যায়ে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাজেট সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের এক ধারাবাহিক বৈঠকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার খসড়াতেও এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তিন ধাপে যেভাবে বাস্তবায়িত হবে নতুন কাঠামো
নতুন পে-স্কেলের প্রস্তাব পুরোপুরি কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ ০০০ কোটি টাকা এবং পেনশনারদের জন্য আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই বিশাল আর্থিক চাপ সামলানো এবং বাজারে হঠাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার কৌশলগতভাবে তিন ধাপে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
প্রথম ধাপ (২০২৬-২৭ অর্থবছর): আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামোর অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের (বেসিক) ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। এজন্য আসন্ন বাজেটে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে এই সময়ে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): মূল বেতনের সঙ্গে সব ধরনের আনুষঙ্গিক ভাতা (বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ইত্যাদি) এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাগুলো পুরোপুরি সমন্বয় ও কার্যকর করা হবে।
সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা এই নতুন কাঠামোর আওতায় আসবেন।
গ্রেড ও প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ এবং পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত থাকছে। তবে নতুন কাঠামোতে গ্রেডভেদে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
| বিবরণ | বিদ্যমান কাঠামো (টাকা) | প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো (টাকা) |
| সর্বনিম্ন বেতন (২০তম গ্রেড) | ৮,২৫০/- | ২০,০০০/- |
| সর্বোচ্চ বেতন (১ম গ্রেড – নির্ধারিত) | ৭৮,০০০/- | ১,৬০,০০০/- |
এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিবদের জন্য এই ২০টি ধাপের বাইরে আলাদা বিশেষ ধাপ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
ভাতা ও পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর
নতুন পে-স্কেলে শুধু কর্মরতরাই নন, বড় সুবিধা পেতে যাচ্ছেন পেনশনভোগীরাও। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী:
২০ হাজার টাকার কম মাসিক পেনশনে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি।
২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি।
৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা, বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা, এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা ও তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ি ভাড়া ভাতা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, তিন বছরের এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সামগ্রিক বাজারে নতুন করে কোনো মূল্যস্ফীতির চাপ পড়বে না এবং সরকারের নগদ অর্থায়ন ব্যবস্থাপনাও অনেক সহজ হবে। এর আগে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছর এই জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল, যা গত জানুয়ারি মাসে প্রতিবেদন জমা দেয়। দীর্ঘ ১১ বছর পর (সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৮ম পে-স্কেলের পর) এই উদ্যোগ দেশের সরকারি চাকুরেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও কাজের গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



