১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল : ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ৩ ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি, বিচার বিভাগ ও বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়নের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই এই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আসন্ন জাতীয় বাজেটে এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ রাখা হতে পারে। তবে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক বিবেচনা করে বেতন কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না করে, মোট তিনটি ধাপে তা সম্পূর্ণ করার ইঙ্গিত দিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
৩ ধাপে বাস্তবায়ন ও বাজেট বরাদ্দ
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য বরাদ্দ রাখা হতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রথম ধাপ (২০export২৬-২৭ অর্থবছর): নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপে মূল বেতনের (বেসিক) একাংশ বা ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি অংশ কার্যকর করা হবে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর): অন্যান্য ভাতা ও আর্থিক সুবিধাসমূহ শতভাগ বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে।
উল্লেখ্য, সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বেসামরিক প্রশাসন, জুডিশিয়াল সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশনের কাজও এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
গ্রেড ও প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো
নতুন সুপারিশে সরকারি চাকরির বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হচ্ছে। তবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্কেলে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে:
| বিবরণ | বিদ্যমান বেতন (টাকা) | প্রস্তাবিত নতুন বেতন (টাকা) | বৃদ্ধির হার (সম্ভাব্য) |
| সর্বনিম্ন মূল বেতন (২০তম গ্রেড) | ৮,২৫০ | ২০,০০০ | ১০০% থেকে ১৪০% |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন (১ম গ্রেড) | ৭৮,০০০ | ১,৬০,০০০ | ১০৫% (প্রায়) |
ভাতার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন
নতুন বেতন কাঠামোতে বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রে যৌক্তিক ও কল্যাণমুখী পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে:
বাড়ি ভাড়া: ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত চাকরিজীবীদের জন্য তুলনামূলক কম হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিপরীতে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য এই হার বেশি রাখার কথা বলা হয়েছে।
যাতায়াত ভাতা: যাতায়াত সুবিধার পরিধি বাড়িয়ে এবার ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত এই ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যান্য ভাতা: টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা এবং বৈশাখী ভাতা বিদ্যমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া কোনো চাকরিজীবীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২,০০০ টাকা সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্য সুখবর
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের স্বস্তির প্রস্তাব এনেছে কমিটি। মাসিক পেনশনের পরিমাণ ও বয়স বিবেচনা করে এই বৃদ্ধি নির্ধারিত হবে:
পেনশনের পরিমাণ ভিত্তিক বৃদ্ধি: মাসিক ২০ হাজার টাকার কম পেনশন প্রাপকদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ, ৪০ হাজার টাকার পেনশনে ৭৫ শতাংশ এবং এর বেশি পরিমাণের পেনশনে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
বয়সভিত্তিক ন্যূনতম পেনশন: বয়স ৭৫ বছরের বেশি হলে ন্যূনতম পেনশন ১০,০০০ টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮,০০০ টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫,০০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর সরকারের এই পদক্ষেপকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন পে-স্কেল পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে তা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও কর্মস্পৃহা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


