আয়কর রিটার্ন নিরীক্ষা ২০২৬ । ট্যাক্স রিটার্নে আপত্তি আসলে করণীয় কি?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮২ অনুযায়ী, স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে (Self-assessment) দাখিলকৃত কোনো আয়কর রিটার্ন যদি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বা সংশ্লিষ্ট আয়কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিরীক্ষা বা অডিট (Audit)-এর জন্য নির্বাচিত হয় এবং করদাতার প্রদর্শিত আয়, ব্যয় বা সম্পদের তথ্যে কোনো অসঙ্গতি বা আপত্তি পাওয়া যায়, তবে তা আইনানুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হয়।
আপনার রিটার্নে কোনো আপত্তি বা অডিট পর্যবেক্ষণ আসলে আইনসম্মতভাবে আপনার করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. উপকর কমিশনারের (DCT) নোটিশ ও অডিট প্রতিবেদন সংগ্রহ
রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হলে বা অডিট শেষে কোনো আপত্তি থাকলে উপকর কমিশনার আপনাকে সরাসরি চিঠি বা নোটিশের মাধ্যমে তা জানাবেন।
কারণ জানা: নোটিশে অডিটের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং আপনার রিটার্নের ঠিক কোন কোন জায়গায় আপত্তি (যেমন: আয়ের উৎস, ব্যাংক হিসাবের অমিল, রেয়াত বা খরচের অসংগতি) তোলা হয়েছে, তা উল্লেখ থাকবে।
দলিলাদি প্রস্তুত করা: যে বিষয়ে আপত্তি এসেছে, তার সপক্ষে আপনার মূল ব্যাংক স্টেটমেন্ট, খরচের রসিদ, সম্পদ ক্রয়ের দলিল বা আয়ের প্রমাণপত্রগুলো গুছিয়ে নিন।
২. সংশোধিত রিটার্ন (Amended Return) দাখিল
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮২(৫) অনুযায়ী, অডিট সমাপনান্তে যদি উপকর কমিশনার দেখেন যে আপনার আয়, ব্যয় বা সম্পদ রিটার্নে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি, তবে তিনি আপনাকে একটি অডিট প্রতিবেদন এবং নোটিশ পাঠাবেন।
নোটিশ পাওয়ার পর, অডিট প্রতিবেদনের ফলাফল বা আপত্তিগুলো মেনে নিয়ে আপনাকে প্রাসঙ্গিক লিখিত ব্যাখ্যা এবং প্রমাণাদিসহ একটি সংশোধিত রিটার্ন (Amended Return) দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হবে।
যদি আপনি আপত্তির বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং তা যৌক্তিক মনে হয়, তবে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করে অতিরিক্ত কর বা প্রযোজ্য অঙ্ক পরিশোধ করে দিলে উপকর কমিশনার সন্তুষ্ট হয়ে অডিট নিষ্পত্তি করবেন এবং আপনাকে একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা পত্র প্রদান করবেন [ধারা ১৮২(৬)]।
৩. শুনানিতে অংশ নেওয়া এবং লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান
যদি কর কর্মকর্তা কর্তৃক উত্থাপিত আপত্তিটি আপনার দৃষ্টিতে ভুল বা অযৌক্তিক মনে হয়, তবে আপনার আইনগত আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ রয়েছে:
লিখিত জবাব: নোটিশে উল্লেখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর কর্মকর্তার আপত্তির বিপরীতে একটি যৌক্তিক ও আইনি ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে লিখিত জবাব দাখিল করুন।
শুনানি (Hearing): শুনানির দিনে উপকর কমিশনারের সামনে উপস্থিত হয়ে (অথবা আপনার নিযুক্ত আয়কর আইনজীবী/আইটিপির মাধ্যমে) প্রয়োজনীয় সমস্ত মূল কাগজপত্র বা প্রমাণাদি প্রদর্শন করুন এবং আপত্তিটি কেন টিকবে না তা বুঝিয়ে বলুন।
৪. একতরফা কর নির্ধারণ (Assessment) এড়ানো
আপনি যদি উপকর কমিশনারের দেওয়া নোটিশের জবাব না দেন, শুনানিতে অংশ না নেন কিংবা আপনার দেওয়া ব্যাখ্যা ও সংশোধিত রিটার্ন যদি সন্তোষজনক না হয়, তবে কর কর্মকর্তা ধারা ১৮৩ বা ক্ষেত্রমত ধারা ১৮৪ (সর্বোত্তম বিচারভিত্তিক কর নির্ধারণ – Best Judgment Assessment) অনুযায়ী নিজস্ব বিবেচনায় আপনার কর ও জরিমানা নির্ধারণ করে দেবেন। তাই নোটিশের জবাব দেওয়া বাধ্যতামূলক।
৫. আপিল (Appeal) দায়ের করা (যদি সমাধান না হয়)
উপকর কমিশনার যদি আপনার শুনানির পর কোনো আপত্তি বহাল রাখেন এবং অতিরিক্ত কর বা জরিমানা দাবি করে একটি চূড়ান্ত কর নির্ধারণী আদেশ (Assessment Order / Demand Notice) জারি করেন, আর আপনি যদি তার সেই আদেশের সাথে একমত না হন, তবে আপনার জন্য পরবর্তী আইনি পথগুলো খোলা থাকবে:
আপিল কমিশনারেট (Joint/Additional/Commissioner of Taxes – Appeals): আদেশ জারির নির্দিষ্ট দিনের (সাধারণত ৬০ দিন) মধ্যে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল আবেদন করতে পারবেন।
ট্যাক্সেস ট্রাইব্যুনাল (Taxes Appellate Tribunal): আপিল কমিশনারের রায়েও সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তী ধাপে ট্রাইব্যুনালে যাওয়া যায়।
পরামর্শ: আয়কর রিটার্নে অডিট বা আপত্তি আসা মানেই কোনো অপরাধ নয়; এটি একটি নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়া। তবে অডিটের নোটিশটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবেলা করা উচিত। জটিলতার এড়াতে আপনার কর অঞ্চলের সার্কেল অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন অথবা একজন অভিজ্ঞ আয়কর আইনজীবী (Tax Advocate) বা আইটিপি (ITP)-এর পরামর্শ নিয়ে লিখিত জবাব ও সংশোধিত রিটার্ন প্রস্তুত করা সবচেয়ে নিরাপদ।



