বৈষম্য । দাবীর খতিয়ান । পুন:বিবেচনা

কোরবানি নাকি ঈদের বাজার? সীমিত বোনাসে দিশেহারা ১১-২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা

পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সারা দেশে উৎসবের আমেজ শুরু হলেও, চরম মানসিক উদ্বেগ ও আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীরা। বর্তমান বাজারদরের সাথে তাদের প্রাপ্ত উৎসব ভাতার (বোনাস) বিশাল ব্যবধানের কারণে এবার অনেকেই কোরবানি দেওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে—তারা কোরবানি দেবেন, নাকি পরিবারের জন্য ঈদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সওদা ও পোশাক কিনবেন, তা নিয়ে নিভৃতে চোখের জল ফেলছেন লাখো কর্মচারী।

বোনাস বনাম পশুর বাজার: এক নির্মম বাস্তবতা

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক) অনুযায়ী এবারের ঈদে প্রাপ্ত বোনাসের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৮,২৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০,০০০ টাকার মধ্যে।

অন্য দিকে, বর্তমান গবাদিপশুর বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একটি মাঝারি বা ছোট আকারের গরুর সর্বনিম্ন দামও ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার নিচে নয়। সেই হিসেবে ৭ ভাগে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (ভাগ কোরবানি) কোরবানি দিতে গেলেও সর্বনিম্ন ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার প্রয়োজন হচ্ছে।

  • সর্বোচ্চ বোনাস: ২০,০০০ টাকা (১১ গ্রেড)

  • সর্বনিম্ন কোরবানির ভাগের খরচ: ২৫,০০০ টাকা

  • ঘাটতি: সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকা (শুধুমাত্র কোরবানির ভাগের জন্য)

এই সমীকরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, একজন ১১ গ্রেডের কর্মচারী তার সম্পূর্ণ বোনাসের টাকা দিয়েও কোরবানির একটি ন্যূনতম ভাগ কিনতে পারছেন না। আর ২০ গ্রেডের একজন কর্মচারী, যিনি মাত্র ৮,২৫০ টাকা বোনাস পাচ্ছেন, তার পক্ষে ভাগে কোরবানি দেওয়ার চিন্তা করাও একপ্রকার অসম্ভব।

সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সংকট

কোরবানির ভাগের টাকা জোগাড় করতেই যেখানে বোনাসের পুরোটা শেষ হয়ে আরও ধারের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, সেখানে ঈদের মূল রসদ (চাল, ডাল, তেল, মশলা) এবং সন্তানদের নতুন পোশাক কেনার টাকা কোথায় পাবেন—এই প্রশ্নে দিশেহারা নিম্ন-ধাপের সরকারি কর্মচারীরা।

অনেকেই আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, সরকারি চাকরি করার কারণে সমাজে তাদের একটি সম্মানজনক স্থান রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বেতন কাঠামো ও আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের বাজারে বোনাসের এই সামান্য টাকা দিয়ে কোরবানি না দিতে পারায় সামাজিক ও পারিবারিকভাবে তারা চরম হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে মুখ দেখানো এবং নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। লোকলজ্জা আর সামাজিক “ছি ছি” র ভয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

নবম পে-স্কেল না হওয়ার প্রভাব: কতজন কোরবানি থেকে বঞ্চিত?

সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর তথ্যানুযায়ী, দেশে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ। দীর্ঘদিন যাবৎ নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা না হওয়ায় এবং মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা না বাড়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়: ১. শতকরা ৮০-৮৫ ভাগ ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারী এবার একক বা ভাগে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য সম্পূর্ণ হারিয়েছেন। ২. নবম পে-স্কেল বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং মহার্ঘ ভাতা বা পর্যাপ্ত উৎসব ভাতা না পাওয়ায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক সরকারি কর্মচারী এবার কোরবানি দিতে পারবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সমাধানের দাবি

ভুক্তভোগী কর্মচারীদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সংগতি রেখে অবিলম্বে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে প্রতি বছর উৎসবের দিনগুলোতে এই বিশাল সংখ্যক সরকারি কর্মজীবী ও তাদের পরিবারকে উৎসবের আনন্দের বদলে কেবলই দীর্ঘশ্বাস আর সামাজিক অবমাননার শিকার হতে হবে। সরকার দ্রুত কোনো বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা মহার্ঘ ভাতার ব্যবস্থা না করলে, এবারের ঈদ লাখো নিম্ন-গ্রেডের কর্মচারীর ঘরে কেবলই নিরানন্দ বয়ে আনবে।

author avatar
admin
আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *