চূড়ান্ত গেজেটে দেরি হলেও ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হচ্ছে ৯ম পে-স্কেল: বাজেট থাকছে বিশেষ থোক বরাদ্দ
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের চাকা অবশেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘুরতে শুরু করেছে। আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগলেও, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের পুনর্গঠিত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক চাপ সামলাতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বিশেষ অর্থ বরাদ্দও রাখা হচ্ছে।
তিন কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও অগ্রগতি
সরকারি চাকরিজীবী, জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য নতুন বেতন স্কেল দ্রুত এগিয়ে নিতে সরকার ইতিপূর্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন’, ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন’ এবং ‘সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি’র প্রতিবেদন সংক্রান্ত সুপারিশ প্রণয়ন কমিটিকে পুনর্গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের আহ্বায়াকত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এই তিনটির মধ্যে ২টি প্রতিবেদনের ওপর দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনা করা হয়েছে। মূলত বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং বাজেট সামঞ্জস্যতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো এই আলোচনায় প্রাধান্য পায়। তৃতীয় প্রতিবেদনটির ওপর আগামী বৈঠকে আলোচনা হবে।
বৈঠক সূত্র জানায়, সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা এবং সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য আনার চেষ্টা চলছে। পুরো প্রক্রিয়াটি শতভাগ নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত করতে আরও কয়েকটি বৈঠকের প্রয়োজন হবে।
বাজেট কৌশল: ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ
চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হতে সময় লাগলেও কর্মচারীদের যেন অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ না হয়, সেজন্য সরকার একটি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছে। আগামী জুনে পেশ হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নতুন পে-স্কেলের জন্য ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি ‘থোক বরাদ্দ’ বা বিশেষ তহবিল রাখা হচ্ছে।
এর ফলে আগামী আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের দিকে যখন পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশিত হবে, তখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১ জুলাই থেকেই বকেয়াসহ (অ্যারিয়ার) নতুন স্কেলের আর্থিক সুবিধা হাতে পাবেন। ফলে প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে কর্মচারীদের কোনো আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না।
অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে বাস্তবায়ন হবে ৩ ধাপে
বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনা করে নবম পে-স্কেল একযোগে নয়, বরং তিনটি অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে:
প্রথম বছর (১ জুলাই ২০২৬ থেকে): বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে মূল বেতনের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে।
দ্বিতীয় বছর (২০২৭-২৮ অর্থবছর): দ্বিতীয় ধাপে মূল বেতনের বাকি অর্ধেক (১০০ শতাংশ পূর্ণ) সমন্বয় করা হবে।
তৃতীয় বছর (২০২৮-২৯ অর্থবছর): শেষ ধাপে গিয়ে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সব ধরনের ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রদান করা হবে।
এক নজরে নতুন পে-স্কেলের রূপরেখা:
কার্যকরের তারিখ: ১ জুলাই, ২০২৬ (২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন)।
বাস্তবায়ন পদ্ধতি: মোট ৩টি ধাপে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
বাজেট বরাদ্দ: ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ।
সুবিধাভোগী: সরকারি কর্মচারী, জুডিশিয়াল সার্ভিস এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যবৃন্দ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এই পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়নে কাজ করছে উচ্চপর্যায়ের কমিটি। গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়াটি টেবিলে থাকলেও ১ জুলাই থেকে কার্যকরের সরকারি সিদ্ধান্ত এখন শতভাগ চূড়ান্ত।



