১০ম গ্রেডে উচ্চতর স্কেল আগে নিলে কি নতুন পে-স্কেলে বেতন কমবে? সরকারি চাকরিজীবীদের বিভ্রান্তি ও আসল নিয়ম
১১তম গ্রেডে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বর্তমানে উচ্চতর গ্রেড এবং সম্ভাব্য ৯ম পে-স্কেল নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালের জুন মাসে যোগদানকারী যেসব কর্মচারীর ২০২৬ সালের জুন মাসে ১০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে, তারা উচ্চতর গ্রেড আগে নেবেন, নাকি নতুন পে-স্কেলের জন্য অপেক্ষা করবেন—তা নিয়ে দোটানায় ভুগছেন।
অনেকে ভাবছেন, আগে উচ্চতর গ্রেড (১০ম গ্রেড) নিলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় বেসিক (মূল বেতন) কমে যেতে পারে। ফলে কেউ কেউ আবেদন না করে পে-স্কেলের অপেক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু অফিসিয়াল রুলস ও ফিক্সেশন বিধিমালা কী বলে? চলুন তথ্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক।
১. টাইমস্কেল/উচ্চতর গ্রেড ও শ্রান্তি-বিনোদন ছুটির পার্থক্য
অনেকেই উদাহরণ দিচ্ছেন যে, শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি জুলাই মাসে পিছিয়ে নেওয়ার কারণে কেউ কেউ ৫-৬শত টাকা বেসিক বেশি পাচ্ছেন।
অফিসিয়াল রুলস ও বাস্তব ব্যাখ্যা: শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি এবং উচ্চতর গ্রেড সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি বা ভাতা নেওয়ার তারিখ নিজের সুবিধামতো কিছুটা এদিক-ওদিক করা সম্ভব হলেও, উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়।
আপনার চাকরির ১০ বছর পূর্ণ হচ্ছে ০৫/০৬/২০২৬ তারিখে। আপনার উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির যোগ্যতা ওই দিন থেকেই অর্জিত হবে। অফিসিয়াল নিয়ম অনুযায়ী, আপনার উচ্চতর গ্রেডের আদেশ পরে বা বিলম্বে জারি হলেও, সেটির আর্থিক সুবিধা এবং বেতন নির্ধারণ (Fixation) ০৫/০৬/২০২৬ তারিখ হতেই কার্যকর করতে হবে। এখানে তারিখ পরিবর্তনের বা পেছানোর কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
২. নতুন পে-স্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের ফিক্সেশন পদ্ধতি
আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, আগে উচ্চতর গ্রেড নিলে নতুন পে-স্কেলে বেসিক কমে যাবে। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং চাকরি বিধিমালা পরিপন্থী।
বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী ফিক্সেশন: নতুন পে-স্কেলের গেজেট যখনই প্রকাশ হোক না কেন, আপনার উচ্চতর গ্রেড যেহেতু ০৫/০৬/২০২৬ তারিখে পাওনা হয়েছে, তাই প্রথমে ২০১৫ সালের বিদ্যমান পে-স্কেল অনুসারেই আপনার ১০ম গ্রেডের বেতন নির্ধারণ (Fixation) সম্পন্ন হবে।
পে-স্কেল এলে সমন্বয়: পরবর্তীতে যখনই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে, তখন নিয়ম অনুযায়ী আগে নতুন পে-স্কেলে সবার বেতন ফিক্সেশন হবে, তারপর সেই নতুন বেসিকের ওপর ভিত্তি করে আপনার ১০ম গ্রেডের উচ্চতর স্কেলটি সমন্বয় করা হবে। ফলে বেতন কমার কোনো সুযোগ নেই।
৩. মাত্র ২০ টাকা বৃদ্ধির ‘রহস্য’ এবং ভবিষ্যতের লাভ
১১তম গ্রেডের সর্বোচ্চ ধাপ বা নির্দিষ্ট ধাপে থাকার কারণে এই মুহূর্তে ১০ম গ্রেডে উচ্চতর স্কেল ফিক্সেশন করলে আপনার মূল বেতন মাত্র ২০/- টাকা বাড়তে পারে। সাময়িকভাবে এই বৃদ্ধি অত্যন্ত সামান্য এবং দুঃখজনক মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল ব্যাপক।
৩২,০০০/- টাকার স্কেল প্রাপ্তি: ১১তম গ্রেডের স্কেল যেখানে ১২,৫০০-৩০,২৩০/- টাকা, সেখানে ১০ম গ্রেডে যাওয়ার সাথে সাথে আপনি ১৬,০০০-৩৮,৬৪০/- টাকার (অনূর্ধ্ব ৩২,০০০/- টাকার সিলিং) স্কেলে প্রবেশ করছেন।
ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের সুবিধা: উচ্চতর গ্রেড অর্থাৎ ১০ম গ্রেডে যাওয়ার ফলে আপনার বেতনের ‘সিলিং’ বা সর্বোচ্চ সীমা এক লাফে অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে পরবর্তীতে যখনই নতুন পে-স্কেল বা বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট লাগবে, তখন আপনার বেতন ১০ম গ্রেডের উচ্চতর ধাপ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। যারা এই মুহূর্তে উচ্চতর গ্রেড না নিয়ে ১১তম গ্রেডেই থেকে যাবেন, নতুন পে-স্কেল এলেও তারা নিচের গ্রেডেই ফিক্সেশন পাবেন, যা ভবিষ্যতে আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ ও পরামর্শ
অফিসিয়াল রুলস ও ফিক্সেশন বিধি বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট বলা যায়, সহকর্মীদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে উচ্চতর গ্রেডের আবেদন আটকে রাখা বা পিছিয়ে দেওয়া নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল।
১/৭/২০২৬ তারিখ থেকে আপনার উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা কার্যকর হবে। সাময়িকভাবে ২০ টাকা বাড়লেও, ১০ম গ্রেড (১৬,০০০/- স্কেল) পাওয়ার কারণে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় আপনি উচ্চতর স্কেলের সুবিধাভোগী হবেন। যারা ইতিমধ্যে দুটি উচ্চতর গ্রেড পেয়েছেন, তাদের সাথে আলাপ করলেও এই নিয়মের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তাই কোনো প্রকার মানসিক চাপ বা প্রেশার না নিয়ে, নিয়ম অনুযায়ী সঠিক সময়ে উচ্চতর গ্রেড গ্রহণ করাই হবে ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।


