প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে বৈষম্যের অভিযোগ: নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোর একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি, তথাপি প্রস্তাবিত বেসিক বেতনের স্তরগুলো বিশ্লেষণ করে অনেকেই দাবি করছেন যে নতুন কাঠামোতে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের তুলনায় উচ্চগ্রেডের কর্মকর্তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাচ্ছেন।
প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১ম পে-কমিশনের সুপারিশে বর্তমান বেসিক বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি ধরে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ১ম গ্রেডের বেসিক বেতন ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব থাকলেও ২০তম গ্রেডের বেসিক বেতন প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ হাজার ৩৭৫ টাকা।
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ১ম ও ২য় গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান ১৮ হাজার টাকা, ২য় ও ৩য় গ্রেডের মধ্যে ১৪ হাজার ২৫০ টাকা, ৩য় ও ৪র্থ গ্রেডের মধ্যে ৮ হাজার ২৫০ টাকা। অন্যদিকে নিম্নস্তরের গ্রেডগুলোতে এই ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের দিকে তাকালে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক গ্রেড থেকে আরেক গ্রেডে বেতনের পার্থক্য মাত্র কয়েকশ থেকে এক-দেড় হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। যেমন ১৯তম ও ২০তম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ৩৬০ টাকা। ১৮তম ও ১৯তম গ্রেডের ব্যবধান ৪৭৫ টাকা এবং ১৭তম ও ১৮তম গ্রেডের ব্যবধান ৩০০ টাকা।
এ অবস্থায় নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে ১ম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত বেতনের ধাপে ধাপে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি রাখা হয়েছে, সেখানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য কেন এত সীমিত বৃদ্ধি রাখা হলো। তাদের মতে, ১২ হাজার টাকার কাছাকাছি বেতন থেকে ১৮ হাজার টাকার পর্যায়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, অথচ উচ্চগ্রেডের ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ অতিক্রম করলেই কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকার পার্থক্য তৈরি হয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, একটি কার্যকর বেতন কাঠামোর অন্যতম শর্ত হলো গ্রেডভিত্তিক ভারসাম্য বজায় রাখা। যদি উচ্চ ও নিম্নস্তরের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য অত্যধিক বেড়ে যায়, তাহলে কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ ও মনোবলহীনতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার সাধারণত দায়িত্ব, দক্ষতা, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকার ভিত্তিতে উচ্চগ্রেডে বেশি বেতন নির্ধারণের যুক্তি দিয়ে থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে বহু সরকারি কর্মচারী ও চাকরিপ্রত্যাশী এই প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত করার আগে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের স্বার্থ বিবেচনায় এনে গ্রেডভিত্তিক ব্যবধান পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এটি এখনো চূড়ান্ত পে-স্কেল নয়। পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের পরই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে। ফলে বর্তমান তালিকায় পরিবর্তনের সুযোগ এখনো রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পে-স্কেলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় এনে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে উচ্চ ও নিম্ন—উভয় স্তরের কর্মচারীই ন্যায্যতার অনুভূতি পান। বর্তমানে আলোচিত খসড়াটি সেই পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ হবে, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।



