৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন চান কর্মচারীরা, বিলম্ব হলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

দীর্ঘ ১১ বছর পরও নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন দ্রুত জারির দাবিতে নতুন করে সরব হচ্ছেন বিভিন্ন পর্যায়ের চাকরিজীবীরা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে পে-স্কেল বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা আর গ্রহণযোগ্য হবে না।

কর্মচারীদের একটি অংশ স্পষ্টভাবে বলছেন, আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি এবং বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করা না হলে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে তারা বাধ্য হবেন।

তাদের ভাষ্য—“প্রজ্ঞাপন চাই, আর কোনো কালক্ষেপণ নয়।”

১১ বছরের অপেক্ষা, বাড়ছে ক্ষোভ

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রায় ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে।

কর্মচারীদের দাবি, গত এক দশকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষার খরচ এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের মূল বেতন কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।

এরই মধ্যে নবম পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশের দাবিতে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন কর্মসূচি পালন করেছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদও দ্রুত গেজেট প্রকাশের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

‘আইএমএফের অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়’

পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইএমএফের শর্ত বা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চাপকে সামনে আনার সম্ভাবনা নিয়েও কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

তবে আন্দোলনপন্থী কর্মচারীরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কর্মচারীদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

তাদের বক্তব্য, “পে-স্কেল বাস্তবায়নে আইএমএফের কোনো অজুহাত কর্মচারীরা মেনে নেবে না। ১১ বছর অপেক্ষার পর নতুন করে কালক্ষেপণ কিংবা নাটকীয়তা আর গ্রহণযোগ্য নয়।”

তবে আইএমএফের কারণে নবম পে-স্কেল আটকে আছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সরকারি ঘোষণা এখন পর্যন্ত সামনে আসেনি। ফলে এ বিষয়ে কর্মচারীদের বক্তব্যকে দাবি ও আশঙ্কা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

কর্মচারী অঙ্গনকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে বারবার বিভিন্ন ধরনের তথ্য, সম্ভাব্য সময়সীমা এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্য সামনে আসায় কর্মচারীদের একটি অংশের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। কখনো নতুন পে-স্কেল, কখনো মহার্ঘ ভাতা, আবার কখনো রেশন সুবিধার আলোচনা সামনে এনে মূল দাবি থেকে কর্মচারীদের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।

কর্মচারীদের ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরকারের সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দূরত্ব বাড়তে পারে এবং সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাদের দাবি, বিষয়টি সাধারণ প্রশাসনিক বিলম্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মচারী অঙ্গনকে অস্থিতিশীল করতে কোনো চক্র সক্রিয় রয়েছে কি না, সেটিও সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দিতে চান কর্মচারীরা

নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির জন্য আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণের দাবি তুলেছেন কর্মচারীদের একটি অংশ।

তারা বলছেন, পে-স্কেল নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটি, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এখন আর শুধু আশ্বাস বা সম্ভাব্য সময়সীমা নয়, দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি এবং বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ না হলে পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনপন্থী কর্মচারীরা।

তবে কর্মসূচি হবে গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ এবং সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা ও প্রচলিত আইন মেনে—এমন অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন তারা।

পে-স্কেল না রেশন—কোনটি অগ্রাধিকার?

সম্প্রতি নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের রেশন সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—কর্মচারীদের প্রধান দাবি কি নতুন পে-স্কেল, নাকি রেশন সুবিধা?

এ বিষয়ে চাকরিজীবীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও অনেকের বক্তব্য, রেশন সুবিধা প্রয়োজনীয় হলেও এটি নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর বিকল্প হতে পারে না।

তাদের যুক্তি, রেশন সুবিধা নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহনসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় মূল বেতন বৃদ্ধি এবং সময়োপযোগী বেতন কাঠামোর প্রয়োজন।

ফলে কর্মচারীদের একটি বড় অংশের অবস্থান—“রেশন সুবিধা চাই, কিন্তু পে-স্কেলের বিকল্প হিসেবে নয়। আমাদের প্রধান দাবি নবম জাতীয় পে-স্কেল।”

আগে থেকেই হয়েছে আন্দোলনের ঘোষণা

নবম পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশের দাবিতে সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন ও ঘোষণা করেছে।

গত মে মাসে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের নেতারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে গেজেট প্রকাশের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচির ঘোষণা দেন। সংগঠনটির নেতারা তখন জানিয়েছিলেন, দাবি আদায় না হলে ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সময়েও গেজেট প্রকাশ ও অন্যান্য দাবি আদায়ে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ফলে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত না এলে কর্মচারীদের আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত চান চাকরিজীবীরা

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, তারা সংঘাত বা প্রশাসনিক অস্থিরতা চান না। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান এবং একটি বৈষম্যহীন ও বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো চান।

তাদের প্রত্যাশা, সরকার দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং কর্মচারীদের জীবনযাত্রার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

একই সঙ্গে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য তারিখ, অর্থায়নের পদ্ধতি, গ্রেডভিত্তিক বেতন বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বক্তব্য দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কর্মচারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত।

তাদের স্লোগান—“প্রজ্ঞাপন চাই, আর কোনো কালক্ষেপণ নয়।”

আর পে-স্কেল না রেশন—এই প্রশ্নে আন্দোলনপন্থী কর্মচারীদের অবস্থান স্পষ্ট: “রেশন সুবিধা প্রয়োজন, তবে প্রধান দাবি নবম জাতীয় পে-স্কেল।”

এখন দেখার বিষয়, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকার বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করে কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায় কি না, নাকি দাবি আদায়ে আবারও নতুন আন্দোলনের পথে যেতে হয় দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *