জিপিএফের মুনাফা হিসাব করবেন যেভাবে: অগ্রিম নিলে কত টাকা কমবে, জানুন সহজ নিয়ম
সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সঞ্চয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সাধারণ ভবিষ্য তহবিল বা জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ড (জিপিএফ)। প্রতি মাসে বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জিপিএফ হিসাবে জমা হলেও অর্থবছর শেষে কত টাকা মুনাফা পাওয়া যাবে, কিংবা জিপিএফ থেকে অগ্রিম নিলে মুনাফার পরিমাণ কতটা কমবে—এ নিয়ে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
জিপিএফের মুনাফা হিসাবের একটি সহজ পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে সংশ্লিষ্ট তথ্যে। সেখানে দুটি উদাহরণের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, একই পরিমাণ প্রারম্ভিক স্থিতি ও মাসিক কর্তনের ক্ষেত্রে অগ্রিম গ্রহণ করলে এবং না করলে মুনাফার অঙ্কে কী ধরনের পরিবর্তন আসে।
অগ্রিম না নিলে মুনাফা কত?
তথ্য অনুযায়ী, মোখলেছুর রহমান নামের একজন সরকারি কর্মচারীর ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে জিপিএফ হিসাবে জমা বা জের ছিল ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরবর্তী ২০২০-২১ অর্থবছরে তিনি প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা হারে জিপিএফে অর্থ জমা করেছেন।
এক্ষেত্রে অর্থবছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিপিএফ থেকে কোনো অগ্রিম গ্রহণ করা হয়নি। উদাহরণে মুনাফা হিসাবের জন্য ১৩ শতাংশ হার ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, মাসিক ৫ হাজার টাকা কর্তনের বিপরীতে নির্ধারিত গুণক ৬.৫ এবং আগের বছরের ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা জেরের ওপর ১৩ শতাংশ হারে মুনাফা যোগ করা হয়েছে।
হিসাবটি দাঁড়ায়—
৫,০০০ × ৬.৫ + ৩,২০,০০০ × ১৩% = ৭৪,১০০ টাকা।
তবে ছবিতে প্রদর্শিত ফলাফলে ৪৫,৮২৫ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে, যা উপরের সূত্রে প্রদত্ত সংখ্যা বসিয়ে হিসাব করলে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, মূল তথ্যে গাণিতিক অসামঞ্জস্য বা মুদ্রণজনিত ভুল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের নিজস্ব জিপিএফ হিসাব নির্ধারণের সময় সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস বা সরকারি হিসাব বিবরণীর তথ্য অনুসরণ করা উচিত।
জিপিএফ থেকে অগ্রিম নিলে কীভাবে মুনাফা কমে?
দ্বিতীয় উদাহরণেও একই ব্যক্তির আগের অর্থবছরের জের ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং মাসিক কর্তন ৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। তবে এবার তিনি ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে জিপিএফ হিসাব থেকে ১ লাখ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করেছেন।
ছবির তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে অগ্রিম গ্রহণ না করার মতো করেই পুরো অর্থবছরের সম্ভাব্য মুনাফা হিসাব করা হয়েছে। এরপর অগ্রিম হিসেবে নেওয়া ১ লাখ টাকার ওপর অবশিষ্ট ছয় মাসের জন্য প্রযোজ্য মুনাফা বাদ দেওয়া হয়েছে।
অগ্রিম নেওয়া অর্থের কারণে বাদ দেওয়ার হিসাব দেখানো হয়েছে—
১,০০,০০০ × ১৩% ÷ ১২ × ৬ = ৬,৫০০ টাকা।
অর্থাৎ, জানুয়ারি মাসে ১ লাখ টাকা অগ্রিম গ্রহণ করায় পরবর্তী ছয় মাসের জন্য ওই টাকার ওপর ৬ হাজার ৫০০ টাকা মুনাফা কমে যাবে।
ছবিতে প্রদর্শিত প্রাথমিক মুনাফা ৪৫ হাজার ৮২৫ টাকা থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মুনাফা দেখানো হয়েছে—
৪৫,৮২৫ – ৬,৫০০ = ৩৯,৩২৫ টাকা।
অগ্রিম নেওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ কেন?
জিপিএফ থেকে অগ্রিম গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি কোন মাসে টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থবছরের শুরুর দিকে বড় অঙ্কের অগ্রিম গ্রহণ করলে তুলনামূলক বেশি সময়ের মুনাফা বাদ যেতে পারে।
অন্যদিকে, অর্থবছরের শেষ দিকে অগ্রিম গ্রহণ করলে কম সময়ের জন্য মুনাফা সমন্বয় করতে হয়। ফলে একই পরিমাণ অর্থ অগ্রিম নেওয়া হলেও উত্তোলনের সময়ের ওপর মুনাফার পার্থক্য তৈরি হতে পারে।
নিজের জিপিএফ হিসাব নিজেই জানা সম্ভব
সরকারি চাকরিজীবীরা আগের অর্থবছরের সমাপনী স্থিতি, চলতি অর্থবছরের মাসিক চাঁদার পরিমাণ, সরকার নির্ধারিত মুনাফার হার এবং অগ্রিম গ্রহণের তথ্য জানা থাকলে সম্ভাব্য জিপিএফ মুনাফার একটি ধারণা পেতে পারেন।
তবে মাসিক চাঁদার পরিবর্তন, বকেয়া জমা, অগ্রিম গ্রহণ ও ফেরত প্রদান, চূড়ান্ত উত্তোলন এবং অর্থবছরের বিভিন্ন সময়ে লেনদেনের কারণে প্রকৃত হিসাব আরও জটিল হতে পারে।
বিশেষ করে জিপিএফ মুনাফার হার সরকার নির্ধারণ করে এবং তা অর্থবছরভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো উদাহরণে ব্যবহৃত ১৩ শতাংশ হারকে বর্তমান অর্থবছরের প্রযোজ্য হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
হিসাবের ভুল এড়াতে অফিসিয়াল বিবরণী যাচাই জরুরি
ছবিতে দেওয়া উদাহরণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে ব্যবহৃত সূত্র, সংখ্যাগত তথ্য ও প্রদর্শিত ফলাফলের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনানুষ্ঠানিক সূত্রে প্রকাশিত জিপিএফ হিসাব সরাসরি অনুসরণ না করে সরকারি হিসাব বিবরণী যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
সারকথা, জিপিএফ থেকে অগ্রিম গ্রহণ করলে উত্তোলিত অর্থ যে সময় পর্যন্ত হিসাবে থাকে না, সেই সময়ের জন্য সংশ্লিষ্ট অর্থের মুনাফা পাওয়া যায় না। ফলে অগ্রিমের পরিমাণ যত বেশি এবং অর্থবছরের যত আগে তা গ্রহণ করা হবে, সম্ভাব্য মুনাফা হ্রাসের অঙ্কও তত বেশি হতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের তাই জিপিএফ থেকে অগ্রিম নেওয়ার আগে প্রয়োজন, উত্তোলনের সময় এবং সম্ভাব্য মুনাফা হ্রাস—এই তিনটি বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।



