পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

২৫ বছরের আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে পেনশন নয়: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আপিল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রায়

সরকারি চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগকারী কোনো কর্মচারী পেনশন ও অবসরজনিত সুবিধা দাবি করতে পারবেন না—এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, প্রচলিত আইন ও বিধিতে নির্ধারিত যোগ্যতামূলক চাকরিকাল পূরণ না করলে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে কাউকে পেনশন সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।

Civil Appeal No. 77 of 2022 মামলায় দেওয়া এই রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগের আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সরকারের আপিল মঞ্জুর করা হয়েছে। মামলাটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় বনাম মো. মাহবুব মুর্শেদ ও অন্যান্যদের মধ্যে পরিচালিত হয়।

আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন। ২০২৬ সালের ৪, ৫ ও ১১ মার্চ মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং ১১ মার্চ রায় ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগকারীদের পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা

মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি চিঠি থেকে জানা যায়, আইন কমিশনে কর্মরত একজন কর্মকর্তা ২৫ বছরের চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি পেনশন সুবিধা চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার আবেদন গ্রহণ করেনি।

প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের ২০১৫ সালের ২৫ মার্চের চিঠিতে পেনশন সুবিধা না দেওয়ার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়।

প্রথমত, সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলে পূর্ববর্তী চাকরিকাল বাজেয়াপ্ত হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পেনশনের জন্য যোগ্য হবেন না বলে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের সংশ্লিষ্ট বিধানে উল্লেখ রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হয়নি। তিনি ২৫ বছরের চাকরিকাল পূর্তির পর প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী পেনশনের জন্য আবেদনও করেননি।

তৃতীয়ত, পেনশন মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ কোন বিধি বা আইনের অধীনে তাকে পেনশন মঞ্জুর করেছিল, তার সুস্পষ্ট উল্লেখ সংশ্লিষ্ট আদেশে পাওয়া যায়নি।

এসব কারণে তার পেনশন কেস ফেরত দেওয়া হয়েছিল।

হাইকোর্টে গিয়েছিলেন চাকরি থেকে পদত্যাগকারী কর্মকর্তা

পেনশন সুবিধা না পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদন করেন। Writ Petition No. 5323 of 2016 নম্বরের ওই মামলায় ২০২১ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বিভাগ আংশিকভাবে রুল অ্যাবসলিউট করেন।

হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের অনুমতি নিয়ে আপিল করে। পরে মামলাটি Civil Appeal No. 77 of 2022 হিসেবে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য আসে।

রাষ্ট্রপক্ষের মূল বক্তব্য ছিল, চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ এবং অবসর গ্রহণ এক বিষয় নয়। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে পদত্যাগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর অতীত চাকরিকাল পেনশন গণনার ক্ষেত্রে কার্যকর থাকে না।

আপিল বিভাগ যা বলেছেন

আপিল বিভাগ মামলাটি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে Bangladesh Service Rules (BSR) এবং Public Servants (Retirement) Act, 1974-এর প্রাসঙ্গিক বিধান বিশ্লেষণ করেছেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ এবং আইনের অধীনে অবসর গ্রহণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

কোনো সরকারি কর্মচারী নির্ধারিত ২৫ বছরের যোগ্যতামূলক চাকরিকাল পূর্ণ করার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে তার পূর্ববর্তী চাকরিকাল পেনশনের জন্য গণনাযোগ্য থাকে না।

ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পেনশন দাবি করার আইনগত অধিকার অর্জন করেন না।

সর্বোচ্চ আদালত আরও স্পষ্ট করেছেন, কোনো কর্মচারী আইন ও বিধি অনুযায়ী পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন না করলে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে তাকে পেনশন দেওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থাৎ, পেনশন কোনো স্বয়ংক্রিয় সুবিধা নয়; প্রচলিত আইন ও বিধিতে নির্ধারিত শর্ত পূরণের পরই একজন সরকারি কর্মচারী এই সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।

২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার গুরুত্ব কোথায়

Public Servants (Retirement) Act, 1974-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারী ২৫ বছরের চাকরিকাল পূর্ণ করার পর নির্ধারিত পদ্ধতিতে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের সুযোগ পান।

অন্যদিকে, ২৫ বছরের চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিলে সেটি সাধারণভাবে ‘অবসর’ হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং ‘পদত্যাগ’ হিসেবে গণ্য হয়।

আপিল বিভাগের রায়ে এই আইনগত পার্থক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত যোগ্যতামূলক চাকরিকাল পূর্ণ না করে পদত্যাগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পেনশন ও অন্যান্য অবসরজনিত সুবিধা দাবি করতে পারবেন না।

হাইকোর্টের রায় বাতিল, সরকারের আপিল মঞ্জুর

সব পক্ষের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে আপিল বিভাগ সরকারের আপিল মঞ্জুর করেন।

এর ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীকে পেনশন সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকছে না।

সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ে মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় চাকরিকাল পূর্ণ না হলে আদালতও কোনো কর্মচারীকে পেনশন প্রদানের নির্দেশ দিতে পারেন না।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রায়টির তাৎপর্য

আপিল বিভাগের এই রায় সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে যারা ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার আগে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের পেনশন ও অবসর সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রায়ের মূল বার্তা হলো—২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পেনশন পাওয়ার যোগ্য হবেন না।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। স্বাভাবিক অবসর, আইন অনুযায়ী ঐচ্ছিক অবসর, সরকার কর্তৃক জনস্বার্থে অবসর প্রদান, চাকরি থেকে অপসারণ এবং স্বেচ্ছায় পদত্যাগ—এসবের আইনগত ফলাফল এক নয়। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট আইন, চাকরির ধরন, চাকরিকাল এবং প্রযোজ্য পেনশন বিধি বিবেচনা করতে হবে।

নতুন নজির তৈরি করল সর্বোচ্চ আদালতের রায়

আইন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে একই ধরনের পেনশন বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ করে কোনো সরকারি কর্মচারী ২৫ বছরের যোগ্যতামূলক চাকরিকাল পূর্ণ করার আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে পরবর্তী সময়ে পেনশন দাবি করলে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আদালতকে আপিল বিভাগের এই রায়ের আইনগত ব্যাখ্যা অনুসরণ করতে হবে।

ফলে সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের আগে চাকরিকাল, পেনশনযোগ্য সেবা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে স্পষ্ট হয়েছে—সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলেই পেনশন পাওয়ার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় না। প্রচলিত আইন ও বিধিতে নির্ধারিত যোগ্যতামূলক চাকরিকাল এবং অবসর গ্রহণের পদ্ধতি অনুসরণ করেই পেনশনের অধিকার অর্জন করতে হবে। ২৫ বছরের আগে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে সেই অধিকার দাবি করা যাবে না।

সোর্স

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *