পে-স্কেল নিয়ে আইএমএফের ‘মাতব্বরি’ মানবে না কর্মচারীরা: ১১ বছরের বঞ্চনা কেন আলোচনায় নেই—উঠছে প্রশ্ন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বা নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মতামত নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নতুন বেতন কাঠামো থেকে বঞ্চিত—এই বাস্তবতা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কর্মচারীদের একটি অংশ বলছে, দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব পরিস্থিতি ও সরকারি ব্যয় নিয়ে যেকোনো প্রতিষ্ঠান মতামত দিতে পারে। তবে বছরের পর বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কতটা কমেছে, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল। এরপর প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন। অথচ এই সময়ে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যেও সরকার স্বীকার করেছে, প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামো কার্যকর থাকায় এবং মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। সরকার ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে।
‘অর্থনৈতিক চাপের কথা বলা হয়, ১১ বছরের বঞ্চনার কথা বলা হয় না’
সরকারি কর্মচারীদের অভিযোগ, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আলোচনা সামনে এলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য চাপের বিষয় সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু একই সময়ে দীর্ঘ ১১ বছরে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কতটা কমেছে, সেই হিসাব খুব কমই আলোচনায় আসে।
তাদের প্রশ্ন, একটি দেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ কি শুধু সরকারের ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মচারীদের পরিবারের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে?
কর্মচারীদের ভাষ্য, ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর সময় যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার মাসের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করতে পারত, বর্তমান বাজারে একই অর্থ দিয়ে সেই জীবনমান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং খাদ্য ব্যয় মেটাতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন।
পে-স্কেল নিয়ে আইএমএফের হস্তক্ষেপের অভিযোগ
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আইএমএফের সম্ভাব্য আপত্তি বা সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কর্মচারীদের একটি অংশ মনে করে, বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ দেশের সরকারের নিজস্ব নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধি কিংবা সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিয়ে পরামর্শ দিতে পারে। তবে দেশের কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
“পে-স্কেল নিয়ে আইএমএফের মাতব্বরি বাংলাদেশে চলবে না”—এমন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কর্মচারীদের বিভিন্ন আলোচনায় ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
কর্মচারীদের দাবি, বাংলাদেশের সংবিধান, আইন, আর্থিক সক্ষমতা এবং দেশের মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতা বিবেচনা করেই সরকারকে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ কর্মসূচির শর্ত বা চাপের কারণে দেশের কর্মচারীদের ন্যায্য আর্থিক অধিকার অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সিপিডি-সুজনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়ে দেশের বিভিন্ন গবেষণা ও নাগরিক সংগঠনের বক্তব্য নিয়েও কর্মচারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তাদের অভিযোগ, নতুন বেতন কাঠামোর কারণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি যতটা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না।
কর্মচারীরা বলছেন, সরকারের কোনো উদ্যোগের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। তবে সেই বিশ্লেষণ হওয়া উচিত পূর্ণাঙ্গ এবং ভারসাম্যপূর্ণ।
শুধু নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে কত টাকা ব্যয় হবে—এই হিসাব তুলে ধরলেই হবে না। গত ১১ বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত বেতন কতটা কমেছে, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা কীভাবে সংসার পরিচালনা করছেন এবং দীর্ঘদিন নতুন বেতন কাঠামো না দেওয়ার কারণে কর্মচারীদের জীবনমান ও কর্মস্পৃহায় কী প্রভাব পড়েছে—এসব বিষয়ও গবেষণার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। কর্মচারীদের মতে, সরকারের ঘোষণা এখন আর শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি লাখ লাখ সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রতিশ্রুতি।
তাদের বক্তব্য, সরকার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে, তখন বিভিন্ন মহলের চাপ বা আপত্তির কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসা গ্রহণযোগ্য হবে না।
সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ বলছে, রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পদ্ধতি, সময়সূচি কিংবা ধাপ নির্ধারণ করতে পারে সরকার। কিন্তু দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষার পর নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন আবার অনিশ্চিত করে দেওয়া হলে কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হবে।
বেতন বাড়ানোর সঙ্গে জবাবদিহির প্রশ্নও আলোচনায়
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একটি অংশ মনে করেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা, সেবার মান, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ এবং দুর্নীতিমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে। অর্থাৎ পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রশ্নটি শুধু বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গেও যুক্ত করার কথা বলছেন বিশ্লেষকেরা।
কর্মচারীরাও বলছেন, দায়িত্বশীল ও দুর্নীতিমুক্ত জনপ্রশাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগকে তারা সমর্থন করেন। তবে জবাবদিহির অজুহাত দেখিয়ে ন্যায্য বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা যুক্তিসংগত নয়।
‘ঋণের শর্তে কর্মচারীদের অধিকার নির্ধারণ হতে পারে না’
সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রভাবের বিষয়টি।
কর্মচারীদের ভাষ্য, সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নিতে পারে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু সেই ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মচারীর জীবনযাত্রার বাস্তবতা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
তাদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কোনো অনুদান বা বিশেষ সুবিধা নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার বিনিময়ে এটি তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক।
তাই বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট সময় পরপর বেতন কাঠামো পর্যালোচনা ও সংশোধন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
‘পে-স্কেল কোনো বিলাসিতা নয়, সময়ের দাবি’
সরকারি কর্মচারীদের বক্তব্য, নতুন পে-স্কেলকে শুধু সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না।
একদিকে সরকারি কর্মচারীদের দক্ষতা, সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে তাদের পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য উপযুক্ত বেতন কাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের প্রশ্ন—যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে, তখন ১১ বছর আগের বেতন কাঠামো দিয়ে বর্তমান সময়ের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কতটা বাস্তবসম্মত?
সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশের স্পষ্ট অবস্থান, নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকার। দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে, কিন্তু আইএমএফ বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে এই অঙ্গীকার থেকে সরে আসা যাবে না।
তাদের বার্তা স্পষ্ট—পে-স্কেল নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ‘মাতব্বরি’ বাংলাদেশের গণকর্মচারী সমাজ মেনে নেবে না। দীর্ঘ ১১ বছরের বঞ্চনা, মূল্যস্ফীতিতে ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এখন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের দাবি।
এখন সরকারি কর্মচারীদের দৃষ্টি সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে, নাকি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের চাপ ও অর্থনৈতিক যুক্তির মুখে প্রক্রিয়াটি আবারও বিলম্বিত হবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



