অবসরে ১৮ মাসের কম অর্জিত ছুটি থাকলে কি লাম্পগ্রান্ট মিলবে না? জেনে নিন হিসাবের নিয়ম
সরকারি চাকরি শেষে অবসরকালীন ছুটি (পিআরএল) ও অর্জিত ছুটি নগদায়ন বা লাম্পগ্রান্ট নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রায়ই নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। বিশেষ করে অবসরের সময় কারও অর্জিত ছুটির পরিমাণ ১৮ মাসের কম হলে তিনি আদৌ কোনো টাকা পাবেন কি না, নাকি জমা থাকা ছুটির পরিমাণ অনুযায়ী মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পাবেন—এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিধান ও প্রচলিত হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মচারীর যতটুকু নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি পাওনা থাকবে, তিনি ততটুকু সময়ের জন্যই আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হবেন। অর্থাৎ ১৮ মাস পূর্ণ না হলে কোনো অর্থই পাওয়া যাবে না—এ ধারণা সঠিক নয়।
১৬ মাস ছুটি থাকলে কি ১৬ মাসের মূল বেতন পাওয়া যাবে?
অবসরের সময় একজন সরকারি কর্মচারীর যদি পিআরএল বাদে ১৬ মাসের নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি পাওনা থাকে, তাহলে তিনি ওই ১৬ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ছুটি নগদায়ন হিসেবে পেতে পারেন।
এক্ষেত্রে ১৮ মাস হচ্ছে ছুটি নগদায়নের সর্বোচ্চ সীমা। এটি সর্বনিম্ন যোগ্যতার শর্ত নয়। ফলে কারও ১০ মাস, ১৪ মাস বা ১৬ মাস নগদায়নযোগ্য ছুটি থাকলে প্রাপ্য ছুটির পরিমাণ অনুযায়ী অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে পিআরএলসহ মোট অর্জিত ছুটি ১৬ মাস হলে হিসাবটি ভিন্ন হবে। কর্মচারী যতদিন পিআরএল ভোগ করবেন, সেই সময়ের ছুটি বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট নগদায়নযোগ্য ছুটির বিপরীতে লাম্পগ্রান্ট নির্ধারণ করা হবে।
প্রথমে পিআরএলের জন্য ১২ মাসের ছুটি সংরক্ষণ
অবসরের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রথমে সর্বোচ্চ ১২ মাসের অবসর-উত্তর ছুটি বা পিআরএলের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।
একজন কর্মচারী পূর্ণ ১২ মাস পিআরএল ভোগ করলে ওই সময়ে বিধি অনুযায়ী মূল বেতন এবং প্রযোজ্য ভাতাদি পাওয়ার বিষয়টি বিবেচিত হয়। এরপর অবশিষ্ট নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি লাম্পগ্রান্ট হিসেবে হিসাব করা হয়।
অর্থাৎ একজন কর্মচারীর মোট ৩০ মাস নগদায়নযোগ্য পূর্ণ গড় বেতনের অর্জিত ছুটি থাকলে তিনি সর্বোচ্চ ১২ মাস পিআরএল ভোগ এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধা পেতে পারেন।
পূর্ণ সুবিধার জন্য কেন ৩০ মাসের ছুটি প্রয়োজন?
অবসরকালীন সর্বোচ্চ সুবিধার হিসাবটি সহজভাবে বোঝালে—
প্রথম ১২ মাসের অর্জিত ছুটি প্রয়োজন পূর্ণ মেয়াদের পিআরএল ভোগের জন্য। এরপর আরও সর্বোচ্চ ১৮ মাসের অর্জিত ছুটি প্রয়োজন লাম্পগ্রান্ট বা ছুটি নগদায়নের জন্য।
ফলে পূর্ণ ১২ মাস পিআরএল এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন—দুই সুবিধা সম্পূর্ণভাবে পেতে মোট ৩০ মাসের নগদায়নযোগ্য পূর্ণ গড় বেতনের অর্জিত ছুটি প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ৩০ মাসের কম ছুটি থাকলেই সব সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে—এমন নয়। প্রাপ্য ছুটির পরিমাণ অনুযায়ী পিআরএল ও ছুটি নগদায়নের হিসাব নির্ধারিত হবে।
ছুটি কম থাকলে কীভাবে হিসাব হবে?
ধরা যাক, একজন কর্মচারীর অবসরের সময় মোট ২৮ মাসের নগদায়নযোগ্য পূর্ণ গড় বেতনের অর্জিত ছুটি রয়েছে।
তিনি পূর্ণ ১২ মাস পিআরএল ভোগ করলে অবশিষ্ট থাকবে ১৬ মাস। সেক্ষেত্রে অবশিষ্ট ১৬ মাসের ছুটির বিপরীতে মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ লাম্পগ্রান্ট হিসেবে পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
আবার কারও মোট নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি ২৫ মাস হলে এবং তিনি পূর্ণ ১২ মাস পিআরএল ভোগ করলে অবশিষ্ট ১৩ মাসের ছুটি নগদায়নের জন্য বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৮ মাস পর্যন্ত লাম্পগ্রান্ট পাওয়া গেলেও একজন কর্মচারীর প্রকৃত প্রাপ্যতা নির্ভর করবে তাঁর ছুটির হিসাবে কতটুকু নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি জমা রয়েছে তার ওপর।
অর্ধ গড় বেতনের ছুটিও হিসাবে আসতে পারে
এক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্ধ গড় বেতনের অর্জিত ছুটি।
প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী, অবসরের সময় জমা থাকা অর্ধ গড় বেতনের ছুটি নির্ধারিত পদ্ধতিতে পূর্ণ গড় বেতনের ছুটিতে রূপান্তর করে মোট নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটির সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে।
সহজভাবে বললে, নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী দুই দিনের অর্ধ গড় বেতনের ছুটি এক দিনের পূর্ণ গড় বেতনের ছুটির সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ফলে শুধু পূর্ণ গড় বেতনের অর্জিত ছুটির হিসাব দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কর্মচারীর ছুটি হিসাবের খতিয়ানে থাকা পূর্ণ গড় ও অর্ধ গড় বেতনের ছুটি যাচাই করে প্রকৃত প্রাপ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।
চাকরিজীবনে ছুটি ভোগ করলে কি অবসরকালীন সুবিধা কমবে?
চাকরিজীবনে অর্জিত ছুটি ভোগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ছুটির হিসাব থেকে তা সমন্বয় করা হয়। ফলে অবসরের সময় নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কমে গেলে পিআরএল বা লাম্পগ্রান্টের পরিমাণে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে একজন কর্মচারী চাকরিজীবনে ছুটি নিয়েছেন বলেই তাঁর পেনশন বাতিল বা মূল পেনশন সুবিধা কমে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, অবসরের সময় তাঁর হিসাবে কতটুকু অর্জিত ছুটি জমা রয়েছে।
যদি পর্যাপ্ত ছুটি জমা থাকে, তাহলে চাকরিজীবনে ছুটি ভোগ করার পরও পূর্ণ পিআরএল ও সর্বোচ্চ ছুটি নগদায়নের সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
৩০ মাসের বেশি ছুটি থাকলে অতিরিক্ত অর্থ মিলবে?
অবসরের সময় কারও হিসাবে ৩০ মাসের বেশি অর্জিত ছুটি জমা থাকতে পারে। তবে পিআরএল ও ছুটি নগদায়নের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার বাইরে অতিরিক্ত ছুটির বিপরীতে বাড়তি আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না।
অর্থাৎ পূর্ণ ১২ মাস পিআরএল এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের লাম্পগ্রান্টের প্রয়োজনীয় ছুটির চেয়ে বেশি ছুটি জমা থাকলেও অতিরিক্ত ছুটির জন্য আলাদা নগদ অর্থ পাওয়ার সুযোগ নেই।
অবসরের আগে ছুটির হিসাব যাচাই গুরুত্বপূর্ণ
সরকারি কর্মচারীদের অবসরের কয়েক মাস আগে সার্ভিস বুক, ছুটি হিসাব এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের রেকর্ড যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে পূর্ণ গড় বেতনের অর্জিত ছুটি, অর্ধ গড় বেতনের অর্জিত ছুটি, আগে ভোগ করা ছুটি এবং পিআরএলের জন্য প্রয়োজনীয় ছুটির হিসাব সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন শাখা ও হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্ধ গড় বেতনের ছুটি রূপান্তরসহ প্রকৃত নগদায়নযোগ্য ছুটির পরিমাণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
সারকথা
অবসরের সময় ১৮ মাসের কম অর্জিত ছুটি থাকলে কোনো অর্থই পাওয়া যাবে না—এ ধারণা সঠিক নয়। একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর হিসাবে যতটুকু নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি পাওনা থাকবে, বিধি অনুযায়ী ততটুকু ছুটির বিপরীতে আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।
তবে পূর্ণ ১২ মাসের পিআরএল এবং সর্বোচ্চ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধা পেতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নগদায়নযোগ্য অর্জিত ছুটি থাকতে হবে। মোট ছুটি কম থাকলে প্রাপ্যতার হিসাবও সেই অনুপাতে নির্ধারিত হবে।
তাই অবসরের আগে নিজের ছুটি হিসাব যাচাই, অর্ধ গড় বেতনের ছুটি রূপান্তরের সুযোগ পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে প্রকৃত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


