নবম পে স্কেল নিয়ে অর্থমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, গেজেটের আগে মিলল ৫টি আশ্বাস
নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অপেক্ষা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠককে ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বৈঠকে মন্ত্রীর বক্তব্যের বরাত দিয়ে মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, পে স্কেলের সারসংক্ষেপ বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদের গঠিত কমিটির পর্যালোচনায় রয়েছে। কমিটির পর্যালোচনা শেষ হওয়ার পরই গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে।
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশে সময় লাগলেও ১ জুলাই ২০২৬ থেকেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সরকারি অবস্থান বহাল রয়েছে। এর অর্থ হলো, গেজেট প্রকাশের তারিখ এবং কার্যকর হওয়ার তারিখ এক বিষয় নয়—গেজেট পরে প্রকাশিত হলেও কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে দেখানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনায় রাখছে।
এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির পর্যালোচনা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার তথ্য এসেছে। জুলাই মাসেও কমিটি পে স্কেলের সুপারিশ চূড়ান্ত করতে একাধিক বৈঠক করেছে।
গেজেটের আগে মন্ত্রীর বক্তব্যে যে ৫টি বিষয় স্পষ্ট
১. সারসংক্ষেপ পর্যালোচনা করছে মন্ত্রিপরিষদের কমিটি
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পে স্কেলের সারসংক্ষেপ এখন মন্ত্রিপরিষদের গঠিত কমিটি পর্যালোচনা করছে। এই পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
অর্থাৎ, বর্তমানে বিষয়টি শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে নেই; বরং উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার কাজ চলছে। এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে সচিব কমিটির একাধিক বৈঠকের কথা উঠে এসেছে।
২. বেতন বৈষম্য কমানোর চেষ্টা থাকবে
বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাসগুলোর একটি হলো—নতুন পে স্কেলে বিদ্যমান বেতন বৈষম্য যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। কারণ নতুন পে স্কেলের ক্ষেত্রে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্রেডগুলোর মধ্যে বেতন ব্যবধান কীভাবে যৌক্তিক করা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত কমানোর প্রস্তাবসহ বিভিন্ন কাঠামোগত পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছিল। তবে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত কাঠামো কমিটির পর্যালোচনা ও সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
৩. উচ্চতর গ্রেড বাতিল হবে না—বিকল্প সুবিধা ছাড়া
সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো উচ্চতর গ্রেড। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে দেওয়া কোনো সুবিধা সরাসরি বাতিল করা হবে না। যদি কোনো সুবিধা পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে তার বিকল্প সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
এ বক্তব্য চাকরিজীবীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ নতুন পে স্কেলের কাঠামো পরিবর্তনের সঙ্গে পূর্বের বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা, উচ্চতর গ্রেড কিংবা ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত সুবিধা কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।
ফলে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত উচ্চতর গ্রেড বাতিল বা বহাল থাকার বিষয়ে অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্তে না গিয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
৪. আর্থিক সংকট থাকলেও পে স্কেল বাস্তবায়ন করবে সরকার
দেশের আর্থিক পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জিং হলেও সরকার পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে পিছিয়ে যাবে না—বৈঠকে অর্থমন্ত্রী এমন আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। এ কারণে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বাজেটের ওপর চাপ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে কমিটিতে আলোচনা চলছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আর্থিক সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ব্যয়ের বিষয়টিকে পে স্কেলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আর্থিক সংকটকে পে স্কেল বাতিল বা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি বাস্তবায়নের পথ খোঁজা হচ্ছে।
৫. গেজেট যেদিনই হোক, কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে
বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি হলো—গেজেট প্রকাশের সময় যাই হোক, পে স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে বাস্তবায়ন করা হবে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। গেজেট প্রকাশের তারিখ এবং পে স্কেলের কার্যকর হওয়ার তারিখ আলাদা হতে পারে। অর্থাৎ প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়ার কারণে গেজেট পরে প্রকাশ হলেও সরকার যদি ১ জুলাইকে কার্যকর তারিখ হিসেবে বহাল রাখে, তাহলে পরবর্তী সময়ে বেতন নির্ধারণ ও প্রাপ্য আর্থিক সুবিধার হিসাব সেই কার্যকর তারিখকে কেন্দ্র করেই করার সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগেও অর্থমন্ত্রী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিলেন।
এখন মূল অপেক্ষা গেজেটের
সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক থেকে পাওয়া বার্তায় তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পে স্কেল বাতিল হচ্ছে না, ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার অবস্থান বহাল রয়েছে এবং গেজেট প্রকাশের আগে বৈষম্য ও বিদ্যমান সুবিধাগুলো নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।
তবে গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নতুন পে স্কেলের চূড়ান্ত বেতন কাঠামো, গ্রেডভিত্তিক বেতন, ভাতা, উচ্চতর গ্রেড এবং অন্যান্য সুবিধা সম্পর্কে কোনো সংখ্যাকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ বাস্তবায়ন কমিটির সুপারিশের পরও সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনই হবে আইনগতভাবে কার্যকর ভিত্তি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা করা এবং গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের পরিবর্তে সরকারি সিদ্ধান্তকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা।
মাহমুদুল হাসানের দেওয়া বৈঠকের বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও চাকরিজীবীদের ধৈর্য ধরার এবং সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে এখন সবার নজর মন্ত্রিপরিষদের পর্যালোচনা শেষ হওয়া এবং বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের দিকে।



