৯ম পে স্কেল নিউজ ২০২৬

নবম পে-স্কেলে কর্মচারীদের নতুন দাবি: সর্বনিম্ন ২০ হাজারের নিচে নয়, ১০–২০ গ্রেডে ধাপ পুনর্বিন্যাসের আহ্বান

নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা ও উদ্বেগ—দুই-ই বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, গ্রেডভিত্তিক বেতন ব্যবধান, ধাপের সামঞ্জস্য এবং দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে নতুন করে দাবি তুলেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি

সংগঠনটির সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, সচিব কমিটির প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতন কোনোভাবেই কমানো যাবে না। বরং বর্তমান বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সর্বনিম্ন বেতন আরও বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের বেতনধাপ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনর্বিন্যাস এবং কর্মচারীদের মর্যাদা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজারের নিচে নয়

নবম পে-স্কেল নিয়ে ১৫ আগস্ট দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি জানায়, সচিব কমিটির সুপারিশ করা সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা বেতনও যদি কাটছাঁট করা হয়, তাহলে তা কর্মচারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় এই ২০ হাজার টাকাও খুব বেশি নয়; বরং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ন্যূনতম বেতন আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। বিভিন্ন প্রকাশিত পে-স্কেল সংক্রান্ত তথ্যে সচিব কমিটির প্রস্তাব হিসেবে ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা মূল বেতনের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ বর্তমান মূল বেতনের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

তবে কর্মচারী সংগঠনগুলোর বক্তব্য হলো, কেবল শতাংশের হিসাবে বেতন বৃদ্ধি দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। দীর্ঘ সময় ধরে বেতন কাঠামোর বড় পরিবর্তন না হওয়া এবং একই সময়ে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ বাড়ার কারণে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

১০–২০ গ্রেডে ধাপের সামঞ্জস্য চান কর্মচারীরা

সাম্প্রতিক দাবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের বেতনধাপকে আরও বাস্তবসম্মত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা

কর্মচারীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, নিম্ন গ্রেডে দায়িত্ব, কাজের চাপ, অভিজ্ঞতা ও চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির সুযোগ যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে নতুন পে-স্কেলেও পুরোনো অসন্তোষ থেকে যেতে পারে।

তাদের প্রত্যাশা—একটি গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেতন ব্যবধান এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার আর্থিক সুফল স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ধাপও এমন হতে হবে, যাতে দীর্ঘ চাকরিজীবনে কর্মচারীরা বাস্তব আর্থিক সুবিধা পান।

‘বিশেষ সুবিধা’ নয়, প্রাপ্য অধিকার চান কর্মচারীরা

সংগঠনটির প্রচারিত দাবিগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো—কর্মচারীরা কোনো বিশেষ সুবিধা বা অতিরিক্ত অনুগ্রহ চান না; তারা ন্যায্য ও বৈষম্যহীন বেতন কাঠামো চান।

এ অবস্থানটি মূলত নতুন পে-স্কেলের দর্শন নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। একটি বেতন কাঠামো শুধু বেতন বাড়ানোর হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িত থাকে কর্মচারীর জীবনযাত্রার মান, পদমর্যাদা, দায়িত্ব, ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ভাতার বাস্তব মূল্য।

তাই কর্মচারীদের দাবি, নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের সময় শুধু সরকারি ব্যয়ের হিসাব নয়, কর্মচারীদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

২২ লাখ কর্মচারী ও পরিবারের প্রত্যাশা

কল্যাণ সমিতির বক্তব্যে প্রায় ২২ লাখ সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারের প্রত্যাশার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং অনেকে ধারদেনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

এ কারণেই সংগঠনটি চায়, নতুন পে-স্কেল শুধু কাগজে বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা না হয়ে কর্মচারীদের বাস্তব জীবনমান উন্নয়নের হাতিয়ার হোক।

৩৫ হাজার টাকা দাবির পেছনের যুক্তি

এর আগে জাতীয় বেতন কমিশনের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সংগঠনটির পক্ষ থেকে দুটি পে-স্কেল সমন্বয় করে সর্বনিম্ন ৩৫ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতনের প্রস্তাব সামনে আসে।

অর্থাৎ ২০ হাজার টাকা নিয়ে বর্তমান দাবি মূলত একটি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য সীমা নিশ্চিত করার অবস্থান। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০ হাজার টাকার প্রস্তাবও যদি আরও কমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে নতুন বেতন কাঠামোতে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের প্রত্যাশা আরও ভেঙে পড়বে।

সর্বোচ্চ বেতন নিয়ে বৈষম্যের প্রশ্ন

কর্মচারী সংগঠনটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে ১:৪ অনুপাতে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা থাকলেও পরবর্তী সুপারিশে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার বিষয়টি এসেছে। সংগঠনটি মনে করছে, সর্বনিম্ন বেতন যথেষ্ট না বাড়িয়ে সর্বোচ্চ বেতন বাড়ানো হলে বেতন বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

এখানেই নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্নটি সামনে আসে—বেতন কাঠামো কি শুধু ওপরের স্তরের বেতন বাড়াবে, নাকি নিচের স্তরের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারেও সমান গুরুত্ব দেবে?

মূল বেতন এক ধাপে বাস্তবায়নের দাবিও রয়েছে

এর আগেও বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি প্রস্তাব দিয়েছিল, নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন যদি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে কর্মচারীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পেতে দেরি করবেন। সংগঠনটি প্রথম ধাপেই শতভাগ মূল বেতন কার্যকর এবং পরবর্তী ধাপে বড় ভাতাগুলো বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল।

তাদের যুক্তি, মূল বেতন বাড়লে সেটির প্রভাব অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও কর্মচারীদের দৈনন্দিন আর্থিক সক্ষমতার ওপর পড়ে। ফলে মূল বেতন দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে মূল্যস্ফীতির কারণে ঘোষিত বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল কমে যেতে পারে।

দ্রুত সিদ্ধান্ত ও প্রজ্ঞাপনের দাবি

কর্মচারী সংগঠনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো—নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রজ্ঞাপন জারি করা।

সাম্প্রতিক সময়ে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সক্ষমতা, ধাপে বাস্তবায়ন, ভাতা কাঠামো ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে আলোচনা চলেছে। জুলাই মাসের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট সচিব কমিটির সামনে আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

ফলে এখন কর্মচারীদের দৃষ্টি মূলত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

এখন মূল নজর সরকারের সিদ্ধান্তে

নবম পে-স্কেল নিয়ে কর্মচারীদের দাবিগুলোকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা মূল বেতনকে ন্যূনতম ভিত্তি হিসেবে ধরে আরও বাড়ানোর দাবি রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১০–২০ গ্রেডের বেতনধাপের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য চাওয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, বেতন বৈষম্য কমিয়ে কর্মচারীদের মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। চতুর্থত, মূল বেতন দ্রুত বাস্তবায়ন এবং নতুন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সচিব কমিটির সুপারিশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন—এগুলো এক নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যা ও প্রস্তাবকে তাই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে বিবেচনা না করে প্রস্তাব বা সুপারিশ হিসেবে দেখা উচিত

সবশেষে, কর্মচারী সংগঠনটির মূল বার্তা হলো—নতুন পে-স্কেল এমন হতে হবে, যেখানে কোনো বিশেষ শ্রেণিকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে দায়িত্ব, পদ, যোগ্যতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় একটি ন্যায্য, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে। এখন সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ২০ হাজার টাকা, ৩৫ হাজার টাকা, ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য অঙ্কগুলো সংশ্লিষ্ট সংগঠন/প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে থাকা প্রস্তাব ও দাবির ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে; চূড়ান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে চূড়ান্ত বেতন কাঠামো হিসেবে ধরা যাবে না।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *