নতুন পে স্কেলে বড় প্রশ্ন: নিচের গ্রেডে বেতন ব্যবধান এত কম কেন?
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো—‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’—প্রকাশের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কে কত টাকা বেতন পেলেন, তা নিয়ে। কিন্তু বেতন কাঠামোর আরও গভীর একটি বিষয় রয়েছে, যা শুধু নতুন মূল বেতন দেখলে চোখে পড়ে না। সেটি হলো এক গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে বেতনের ব্যবধান বা Grade-to-Grade Pay Gap।
এই ব্যবধান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের মধ্যে পরপর গ্রেডগুলোর প্রারম্ভিক মূল বেতন অনেক ক্ষেত্রে মাত্র কয়েকশ টাকা করে কমেছে। বিপরীতে ৯ম ও ১০ম গ্রেডের মধ্যে রয়েছে তুলনামূলকভাবে বড় অঙ্কের ব্যবধান। ফলে নতুন বেতন কাঠামোতে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডে ‘pay compression’ বা বেতন ব্যবধান সংকুচিত হওয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে এই কাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ঠকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো সরকারি নথিভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং গেজেটের অঙ্ক বিশ্লেষণ করলে যে কাঠামোগত বৈষম্য বা অসামঞ্জস্যের প্রশ্ন তৈরি হয়, সেটিই এখানে আলোচনার বিষয়।
১১ থেকে ২০ গ্রেড: কয়েকশ টাকার ব্যবধানেই একের পর এক গ্রেড
নতুন বেতন স্কেলে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০, ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার, ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০, ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ এবং ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ টাকা।
এরপর ১৪তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০, ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার, ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ এবং ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার টাকা। প্রকাশিত বেতন সারণিতে এই গ্রেডগুলোর প্রারম্ভিক বেতনগুলোই দেখানো হয়েছে।
অর্থাৎ শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট:
| গ্রেড | প্রারম্ভিক মূল বেতন | আগের গ্রেডের সঙ্গে ব্যবধান |
|---|---|---|
| ২০ | ২০,০০০ | — |
| ১৯ | ২০,৫০০ | ৫০০ |
| ১৮ | ২১,০০০ | ৫০০ |
| ১৭ | ২১,৪০০ | ৪০০ |
| ১৬ | ২১,৯০০ | ৫০০ |
| ১৫ | ২২,৮০০ | ৯০০ |
| ১৪ | ২৩,৫০০ | ৭০০ |
| ১৩ | ২৪,০০০ | ৫০০ |
| ১২ | ২৪,৩০০ | ৩০০ |
| ১১ | ২৫,০০০ | ৭০০ |
এখানে দেখা যাচ্ছে, ১১–২০ গ্রেডের সব ব্যবধান ৫০০–৭০০ টাকা নয়—কিছু ক্ষেত্রে ৩০০, ৪০০, ৫০০, ৭০০ এবং ৯০০ টাকাও রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই অংশে গ্রেডগুলোর প্রারম্ভিক বেতনের ব্যবধান অত্যন্ত সংকুচিত।
বিশেষ করে ১২তম ও ১৩তম গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৩০০ টাকা। ১৭ ও ১৮তম গ্রেডে ৪০০ টাকা। আবার ১৯ ও ২০তম গ্রেডে ৫০০ টাকা।
এখানেই ‘গ্রেডের মর্যাদা’ বনাম ‘বেতনের পার্থক্য’ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
৯ম ও ১০ম গ্রেডে এসে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা সম্ভবত এখানেই।
১০ম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৩২ হাজার টাকা, আর ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক ধাপ গ্রেড পরিবর্তনেই মূল বেতনের পার্থক্য ১৩ হাজার ১০০ টাকা।
শতকরা হিসাবে ১০ম গ্রেডের তুলনায় ৯ম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ২৫ হাজার টাকা থেকে ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার টাকা—ব্যবধান ৭ হাজার টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ।
অর্থাৎ ১১–২০ গ্রেডে যেখানে পরপর গ্রেডের ব্যবধান সাধারণত কয়েকশ টাকা, সেখানে ১০–৯ গ্রেডে এসে ব্যবধান কয়েক হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকার বেশি হয়ে যাচ্ছে।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য।
তাহলে কি নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের ‘ঠকানো’ হয়েছে?
এখানে বিষয়টি একটু সতর্কভাবে দেখা প্রয়োজন।
‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঠকানো হয়েছে’—এটি একটি অভিযোগ বা মূল্যায়ন, গেজেটের প্রমাণিত তথ্য নয়। গেজেটে কেন এমন ব্যবধান রাখা হয়েছে, তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট সরকারি ব্যাখ্যা ছাড়া এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত বলা তথ্যগতভাবে নিশ্চিত করা যায় না।
তবে সংখ্যাগত ফলাফলটি যাচাই করা যায়।
সেই ফলাফল হলো—১১ থেকে ২০ গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতনের পার্থক্য অত্যন্ত কম। ফলে একজন কর্মচারী এক গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত হলেও শুধু প্রারম্ভিক বেতনের কারণে বড় ধরনের আর্থিক লাফ সবসময় দেখা যাচ্ছে না।
এটিই ‘pay compression’ বা বেতন ব্যবধান সংকোচনের মূল প্রশ্ন।
‘গ্রেড’ বাড়ছে, কিন্তু টাকার ব্যবধান কোথায়?
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
ধরা যাক, একজন কর্মচারী ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার টাকা প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে শুরু করলেন।
তার পরের গ্রেড ১৯—২০ হাজার ৫০০ টাকা।
অর্থাৎ গ্রেড বাড়ল, কিন্তু প্রারম্ভিক মূল বেতন বাড়ল মাত্র ৫০০ টাকা।
আবার ১৯ থেকে ১৮—আরও ৫০০ টাকা।
১৮ থেকে ১৭—৪০০ টাকা।
১৭ থেকে ১৬—৫০০ টাকা।
এভাবে কয়েকটি গ্রেড অতিক্রম করেও প্রারম্ভিক মূল বেতনের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে ছোট থাকে।
অন্যদিকে ১০ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে গেলে এক ধাপেই ৩২ হাজার থেকে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা।
এই ব্যবধানের কারণে বেতন কাঠামোর একটি অংশে গ্রেডগুলো ঘনভাবে গুচ্ছবদ্ধ, আর অন্য অংশে গ্রেডগুলোর মধ্যে বড় আর্থিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
বাড়িভাড়া ভাতা এই ব্যবধানকে আরও দৃশ্যমান করে
বেতন ব্যবধানের সঙ্গে যখন শতাংশভিত্তিক ভাতা যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
নতুন গেজেট অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়—
- গ্রেড ২০–১৬: মূল বেতনের ৬০%
- গ্রেড ১৫–১০: ৫০%
- গ্রেড ৯–৫: ৪৫%
- গ্রেড ৪–১: ৪০%
বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখানে একটি অদ্ভুত ‘ক্লিফ’ বা ধাপ দেখা যায়।
গ্রেড ১৬-এর কর্মচারী ৬০% বাড়িভাড়া পাবেন, কিন্তু এক ধাপ ওপরে গ্রেড ১৫-এর কর্মচারী পাবেন ৫০%।
অর্থাৎ পদমর্যাদা ও মূল বেতন বাড়ার সঙ্গে বাড়িভাড়ার শতাংশ কমে যাচ্ছে।
এটি অবশ্যই গেজেটের একটি বাস্তব বৈশিষ্ট্য এবং এর ফলে কর্মচারীদের মধ্যে তুলনামূলক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
একটি সংখ্যাগত উদাহরণ
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা ধরা হলে ৬০% বাড়িভাড়া হবে প্রায় ১৩ হাজার ১৪০ টাকা।
অন্যদিকে ১৫তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু বাড়িভাড়া ৫০% হওয়ায় তা হবে ১১ হাজার ৪০০ টাকা।
অর্থাৎ মূল বেতন প্রায় ৯০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া কমে যাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৭৪০ টাকা।
এখানে শুধু মূল বেতন নয়, ভাতার শতাংশের কাঠামোও মোট পারিশ্রমিকের পার্থক্যকে প্রভাবিত করছে।
এই কারণেই শতাংশভিত্তিক ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রেডের সীমারেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শতাংশভিত্তিক ভাতা কেন নিম্নগ্রেডের ব্যবধান কমাতে পারে না?
এখানে একটি মৌলিক গাণিতিক বিষয় আছে।
ধরা যাক, দুই গ্রেডের বেতনের পার্থক্য খুব কম। তখন উভয় গ্রেডেই একই শতাংশে বাড়িভাড়া বা অন্য কোনো ভাতা দিলে টাকার পার্থক্যও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
অন্যদিকে যদি উচ্চতর গ্রেডে বেতন ব্যবধান অনেক বড় হয়, একই শতাংশের ভাতা দিলে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারী স্বাভাবিকভাবেই বেশি টাকা পাবেন।
অর্থাৎ শতাংশভিত্তিক ভাতা নিজে থেকে গ্রেডগুলোর মধ্যে আর্থিক দূরত্বের সমস্যার সমাধান করে না।
বরং মূল বেতনের কাঠামো যদি অসমভাবে সাজানো হয়, তাহলে শতাংশভিত্তিক ভাতা সেই ব্যবধানকে আরও দৃশ্যমান করতে পারে।
১১–২০ গ্রেডের বেতন কাঠামোয় ‘compression’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বেতন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—দায়িত্ব, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পদমর্যাদার পার্থক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রেডগুলোর মধ্যে যথেষ্ট আর্থিক ব্যবধান থাকা।
যদি দুটি গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য খুব কম হয়, তাহলে কর্মচারীর কাছে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার আর্থিক প্রণোদনা কমে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে ১২তম ও ১৩তম গ্রেডের কথা বলা যায়।
১২তম গ্রেডের শুরু ২৪ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১৩তম গ্রেডের শুরু ২৪ হাজার টাকা। পার্থক্য মাত্র ৩০০ টাকা।
অর্থাৎ প্রায় একই প্রারম্ভিক বেতনের মধ্যে দুটি পৃথক গ্রেড অবস্থান করছে।
একইভাবে ১৭ ও ১৮তম গ্রেডের মধ্যে পার্থক্য ৪০০ টাকা।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে—গ্রেডের সংখ্যা বাড়ানোর অর্থ যদি আর্থিক ব্যবধান খুব সামান্য রাখা হয়, তাহলে গ্রেড কাঠামোর প্রকৃত আর্থিক অর্থ কী?
বিপরীতে ১–৯ গ্রেডে কী হচ্ছে?
উচ্চতর গ্রেডে চিত্রটি তুলনামূলকভাবে আলাদা।
প্রকাশিত বেতন সারণি অনুযায়ী—
- ৯ম গ্রেড: ৪৫,১০০ টাকা
- ৮ম গ্রেড: ৪৭,২০০ টাকা
- ৭ম গ্রেড: ৫৮,০০০ টাকা
- ৬ষ্ঠ গ্রেড: ৭১,০০০ টাকা
- ৫ম গ্রেড: ৮৬,০০০ টাকা
- ৪র্থ গ্রেড: ১,০০,০০০ টাকা
- ৩য় গ্রেড: ১,১৩,০০০ টাকা
- ২য় গ্রেড: ১,৩২,০০০ টাকা
- ১ম গ্রেড: ১,৫৬,০০০ টাকা।
এখানে গ্রেডের সঙ্গে বেতনের অঙ্ক দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষ করে ৬ষ্ঠ, ৫ম, ৪র্থ, ৩য়, ২য় ও ১ম গ্রেডে পরপর ধাপে হাজার হাজার টাকার পার্থক্য রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রয়োজন: ১–৯ গ্রেডের প্রতিটি ধাপে গড়ে ২৮–৩০ শতাংশ ব্যবধান রয়েছে—এমন দাবি গেজেটের প্রারম্ভিক বেতন দিয়ে সরাসরি প্রমাণিত হয় না। উদাহরণ হিসেবে ৮ম থেকে ৯ম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ২,১০০ টাকা। তাই ‘২৮–৩০ শতাংশ’ কথাটি কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হিসাব করা হচ্ছে তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
তবে সামগ্রিক কাঠামোতে ১–৯ গ্রেডের আর্থিক দূরত্ব ১১–২০ গ্রেডের তুলনায় অনেক বেশি—এটি সংখ্যাগতভাবে স্পষ্ট।
তাহলে কি ‘কর্মচারী বনাম কর্মকর্তা’ ব্যবধান বাড়ছে?
নতুন কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ১০ম ও ৯ম গ্রেডের মধ্যকার বড় লাফ।
১০ম গ্রেডকে সাধারণভাবে কর্মচারী শ্রেণির উচ্চতর অংশ এবং ৯ম গ্রেডকে কর্মকর্তার প্রবেশস্তর হিসেবে দেখা হয়—যদিও পদ ও ক্যাডারভেদে শ্রেণিবিন্যাসের বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।
এই সীমারেখায় ৩২ হাজার থেকে ৪৫ হাজার ১০০ টাকার লাফটি তাই শুধু একটি গ্রেড পরিবর্তন নয়; এটি দুই ভিন্ন বেতন অঞ্চলের মধ্যে একটি বড় আর্থিক সীমানা তৈরি করে।
এ কারণেই সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন কাঠামোতে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যকার আর্থিক দূরত্বের প্রশ্নটি পুরোপুরি দূর হয়নি।
‘রাজা-প্রজা’ বিতর্ক কেন উঠছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পে স্কেল নিয়ে কেউ কেউ এমন সমালোচনা করছেন যে, গ্রেড কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে উচ্চতর গ্রেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের আর্থিক দূরত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়। কেউ কেউ এটিকে রূপকভাবে ‘রাজা-প্রজা’ কাঠামো বলছেন।
এটি সমালোচকদের ভাষা, সরকারি গেজেটের ভাষা নয়।
তবে এই সমালোচনার পেছনে যে সংখ্যাগত প্রশ্ন রয়েছে, সেটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ১১–২০ গ্রেডে প্রারম্ভিক বেতনের ব্যবধান যেখানে কয়েকশ টাকা, সেখানে ১০ থেকে ৯ গ্রেডে এক লাফে ১৩ হাজার ১০০ টাকা ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু মূলত গ্রেডগুলোর মধ্যে আর্থিক দূরত্বের অসম বণ্টন।
পুরোনো পে স্কেলেও কি একই সমস্যা ছিল?
২০১৫ সালের বেতন কাঠামোতেও গ্রেডভিত্তিক বেতন ব্যবধান একরকম ছিল না। নতুন ২০২৬ স্কেলেও ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে এবং প্রতিটি গ্রেডের বিপরীতে নতুন বেতনক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন পে স্কেল সম্পূর্ণ নতুন একটি গ্রেড কাঠামো তৈরি না করে বিদ্যমান ২০ গ্রেডের ওপরই নতুন বেতনস্তর বসিয়েছে।
ফলে পুরোনো কাঠামোর কিছু বৈশিষ্ট্য নতুন কাঠামোতেও রয়ে গেছে—এমন বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে।
তবে ‘আগের মতোই বৈষম্য ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়েছে’—এমন সিদ্ধান্তের জন্য নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যসংক্রান্ত অতিরিক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।
শুধু মূল বেতন নয়, মোট আয় দিয়ে বিচার করতে হবে
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো গ্রেডের প্রকৃত সুবিধা বিচার করতে শুধু প্রারম্ভিক মূল বেতন তুলনা করলে হবে না। দেখতে হবে—
মূল বেতন + বাড়িভাড়া + চিকিৎসা ভাতা + টিফিন/অন্যান্য ভাতা + উৎসব ভাতা + ইনক্রিমেন্ট + উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ + অবসরকালীন সুবিধা।
কারণ নতুন পে স্কেলে সব সুবিধা একই সময়ে কার্যকর হচ্ছে না। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের বিভিন্ন সময়ে মূল বেতনের সুবিধা ধাপে ধাপে কার্যকর হবে এবং নতুন বেতন কাঠামোর অন্যান্য ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাই আজকের মূল বেতন দিয়ে আগামী দিনের মোট আয় বিচার করা যাবে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: গ্রেড ব্যবধান কত হওয়া উচিত?
এখানে কোনো একক বৈজ্ঞানিক উত্তর নেই।
তবে একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামোয় সাধারণত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়—
প্রথমত, একই দায়িত্ব ও যোগ্যতার কাছাকাছি পদে অযৌক্তিক বেতন সংকোচন যেন না থাকে।
দ্বিতীয়ত, এক গ্রেড থেকে পরবর্তী গ্রেডে উন্নীত হলে আর্থিক সুবিধা যেন বাস্তব অর্থে অনুভূত হয়।
তৃতীয়ত, নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও প্রয়োজনীয় ভাতার প্রভাব বিবেচনা করে মোট হাতে পাওয়া আয় নির্ধারণ করা।
নতুন কাঠামোয় ১১–২০ গ্রেডে কয়েকশ টাকার ব্যবধান এবং ৯–১০ গ্রেডে ১৩ হাজার ১০০ টাকার ব্যবধান—এই দুই চিত্র পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, গ্রেডগুলোর মধ্যে আর্থিক দূরত্ব সমানভাবে বিতরণ করা হয়নি।
শেষ কথা
নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এ নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের বেতন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ১১–২০ গ্রেডে প্রারম্ভিক বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।
কিন্তু বেতন বাড়া এবং বেতন কাঠামোতে ন্যায্য ব্যবধান থাকা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
নতুন স্কেলের সংখ্যাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১১–২০ গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনগুলো একে অপরের খুব কাছাকাছি। ১২ ও ১৩তম গ্রেডের মধ্যে মাত্র ৩০০ টাকা এবং ১৭ ও ১৮তম গ্রেডের মধ্যে ৪০০ টাকার ব্যবধান রয়েছে। বিপরীতে ১০ম ও ৯ম গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান ১৩ হাজার ১০০ টাকা।
এর সঙ্গে যখন গ্রেডভিত্তিক বাড়িভাড়া যোগ করা হয়, তখন নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—এক গ্রেড থেকে আরেক গ্রেডে উন্নীত হওয়ার সঙ্গে মোট আর্থিক সুবিধা কি যথেষ্ট হারে বাড়ছে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০–১৬ গ্রেডে ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া থাকলেও ১৫–১০ গ্রেডে তা ৫০ শতাংশ এবং ৯–৫ গ্রেডে ৪৫ শতাংশ। ফলে কিছু গ্রেডসীমায় মূল বেতন বাড়লেও শতাংশভিত্তিক বাড়িভাড়ার হার কমে যায়।
সুতরাং নতুন পে স্কেলের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু ‘কার বেতন কত বাড়ল’ দিয়ে করা যাবে না। বরং গ্রেড-টু-গ্রেড বেতন ব্যবধান, ভাতার শতাংশ, মোট হাতে পাওয়া আয়, ইনক্রিমেন্ট এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু একসঙ্গে ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ Pay Gap Analysis করা প্রয়োজন।
এই বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত বলে দিতে পারবে—নতুন বেতন কাঠামো শুধু বেতন বাড়িয়েছে, নাকি দীর্ঘদিনের গ্রেডভিত্তিক আর্থিক দূরত্বের সমস্যাও বাস্তবে কমিয়েছে।




