সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

সরকারি চাকরিজীবীরা কি বৈধভাবে ব্যবসা করতে পারেন? আইন যা বলছে

সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অনেকেই ব্যবসা, অনলাইন ব্যবসা, দোকান বা পারিবারিক উদ্যোগ পরিচালনার বিষয়ে জানতে চান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্যও দেখা যায়—কেউ বলেন সরকারি চাকরিজীবীরা ব্যবসা করতে পারেন না, আবার কেউ বলেন পরিবারের সদস্যের নামে ট্রেড লাইসেন্স করে ব্যবসা করা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। সরকারি কর্মচারীর ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ কী বলে?

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ বাংলাদেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীদের চাকরির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের কাঠামো নির্ধারণ করে। আইনের সংজ্ঞা অংশে ‘বিধি’ বলতে এই আইনের অধীন প্রণীত বিধির পাশাপাশি, বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ ও চাকরির শর্তসংক্রান্ত প্রচলিত বিধিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে সরকারি কর্মচারীর ব্যক্তিগত ব্যবসা বা চাকরির বাইরে অন্য কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান পাওয়া যায় Government Servants (Conduct) Rules, 1979-এর Rule 17-এ।

সরকারি কর্মচারী কি নিজের ব্যবসা করতে পারেন?

সাধারণ নিয়ম হলো—সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারি দায়িত্বের বাইরে কোনো ব্যবসা, চাকরি বা অন্য কোনো কাজ করতে পারবেন না।

Conduct Rules, 1979-এর Rule 17(1)-এ বলা হয়েছে, সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী ব্যবসা বা অন্য কোনো চাকরি/কাজে যুক্ত হতে পারবেন না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও Rule 17-এর এই বিধান উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, শুধু ব্যবসাটি বৈধ হলেই সরকারি কর্মচারীর জন্য সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। ব্যবসা বৈধ হওয়া এবং সরকারি কর্মচারীর সেই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার অনুমতি থাকা—দুটি আলাদা বিষয়।

নন-গেজেটেড কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যতিক্রম রয়েছে।

Rule 17-এর proviso অনুযায়ী, নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারী সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়াই এমন একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ (small enterprise) করতে পারেন, যা পরিবারের শ্রম দিয়ে পরিচালিত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে ওই উদ্যোগের বিবরণ সম্পদের ঘোষণার সঙ্গে দাখিল করতে হবে।

তাই ‘নন-গেজেটেড হলেই যে কোনো ধরনের ব্যবসা করা যাবে’—এমন ধারণা সঠিক নয়। বিধানে small enterprise এবং family labour-এর নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।

পরিবারের সদস্যের নামে ব্যবসা করলে কি সরকারি কর্মচারী নিরাপদ?

এখানে সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা দেখা যায়।

অনেকে মনে করেন, সরকারি কর্মচারী নিজের নামে ট্রেড লাইসেন্স না করে স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যের নামে ট্রেড লাইসেন্স করলেই তিনি ব্যবসা করতে পারবেন। কিন্তু বিষয়টি শুধু ট্রেড লাইসেন্স কার নামে—তার ওপর নির্ভর করে না।

Rule 17(3)-এ বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী তার অধিক্ষেত্রের এলাকায় পরিবারের কোনো সদস্যকে ব্যবসায় যুক্ত করতেও সরকারের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।

অতএব, ‘নিজের নামে না করে পরিবারের নামে করলেই কোনো সমস্যা নেই’—এমন পরামর্শকে সার্বজনীন আইন হিসেবে গ্রহণ করা নিরাপদ নয়।

বিশেষ করে সরকারি কর্মচারী যদি বাস্তবে ব্যবসাটি পরিচালনা করেন, বিনিয়োগ করেন, ব্যবস্থাপনা করেন বা ব্যবসা থেকে প্রত্যক্ষভাবে সুবিধা নেন, তাহলে শুধু কাগজে ব্যবসাটি পরিবারের সদস্যের নামে থাকার বিষয়টি যথেষ্ট নাও হতে পারে।

কোম্পানি পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে

শুধু দোকান বা ছোট ব্যবসাই নয়, সরকারি কর্মচারীর কোম্পানি-সংক্রান্ত ভূমিকার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আছে।

Conduct Rules-এর Rule 16 অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী কোনো ব্যাংক বা অন্য কোম্পানির promotion, registration বা management-এ অংশ নিতে পারবেন না। তবে সরকারের সাধারণ বা বিশেষ আদেশের অধীন নিবন্ধিত সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সুযোগ রয়েছে।

অর্থাৎ, কোনো কোম্পানির পরিচালক, ব্যবস্থাপনা বা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিধি ও অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই করা জরুরি।

‘অবৈধ ব্যবসা’ করার সুযোগ আছে—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল

সরকারি কর্মচারী বৈধ ব্যবসা করতে পারবেন কি না—এটি একটি চাকরিবিধির প্রশ্ন। কিন্তু অবৈধ ব্যবসা করার কোনো অনুমতি সরকারি কর্মচারীকে দেওয়া হয়নি।

ব্যবসাটি আইনত নিষিদ্ধ হলে ট্রেড লাইসেন্স, পারিবারিক সদস্যের নাম বা অন্য কোনো কাগজপত্র ব্যবহার করে সেটিকে বৈধ করা যায় না। আবার বৈধ ব্যবসাও সরকারি চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘন করে পরিচালনা করলে চাকরিগত সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

তাই ‘বৈধ ব্যবসা করা যাবে না, কিন্তু পরিবারের নামে করা যাবে’—এ ধরনের সরলীকৃত বক্তব্য বিভ্রান্তিকর।

অনুমতি নিতে চাইলে কী করবেন?

কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা বা অন্য কোনো কাজ করতে চাইলে প্রথমে নিজের চাকরির ধরন, পদ, গেজেটেড/নন-গেজেটেড অবস্থান, প্রযোজ্য সার্ভিস রুলস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা যাচাই করতে হবে।

প্রয়োজনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করে ব্যবসার ধরন, প্রতিষ্ঠানের নাম, সম্ভাব্য কার্যক্রম, সময়, অবস্থান, নিজের ভূমিকা এবং ব্যবসাটি কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব তথ্য উল্লেখ করে অনুমোদন চাওয়া যেতে পারে।

‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ বললেই যে প্রত্যেক ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তা অনুমোদন দেবেন, এমন নয়। সরকারি চাকরি আইন, প্রযোজ্য আচরণবিধি, সংশ্লিষ্ট সার্ভিস রুল এবং অফিসের delegation of power অনুযায়ী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত হতে পারে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এ ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ’-এর সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে।

ব্যবসা করলে সম্পদের হিসাবের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

নন-গেজেটেড কর্মচারীর ক্ষেত্রে Rule 17-এর family-labour small enterprise ব্যতিক্রম ব্যবহার করা হলে ব্যবসার বিবরণ declaration of assets-এর সঙ্গে দাখিল করার কথা বলা হয়েছে।

এ কারণে ব্যবসার আয়, সম্পদ বা বিনিয়োগ গোপন করার পরিবর্তে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সম্পদের বিবরণ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সহজ ভাষায় সিদ্ধান্ত

বিষয়টি কয়েকটি পয়েন্টে বোঝা যায়—

১. সরকারি কর্মচারী সাধারণভাবে সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া চাকরির বাইরে ব্যবসা বা অন্য কাজ করতে পারবেন না।

২. নন-গেজেটেড কর্মচারীর জন্য family labour-ভিত্তিক small enterprise-এর একটি বিশেষ ব্যতিক্রম রয়েছে।

৩. ওই ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রেও ব্যবসার বিবরণ সম্পদের ঘোষণায় দিতে হবে।

৪. পরিবারের সদস্যের নামে ট্রেড লাইসেন্স করলেই সরকারি কর্মচারীর নিজের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বৈধ হয়ে যায়—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

৫. কোনো কোম্পানির promotion, registration বা management-এ সরকারি কর্মচারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধিনিষেধ রয়েছে।

৬. অবৈধ ব্যবসা করার কোনো সুযোগ সরকারি চাকরির আচরণবিধি দেয় না।

৭. প্রতিরক্ষা, পুলিশ, রেল, কারা বা অন্য বিশেষ শ্রেণির কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পৃথক সার্ভিস রুল/বিধান থাকতে পারে। Conduct Rules, 1979 নিজেই কিছু নির্দিষ্ট সার্ভিস ও পদকে এর সাধারণ প্রয়োগের বাইরে রেখেছে।

শেষ কথা

সুতরাং, ‘সরকারি চাকরি করলে কোনোভাবেই ব্যবসা করা যায় না’—এ কথাটি যেমন পুরোপুরি সঠিক নয়, তেমনি ‘পরিবারের কারও নামে ট্রেড লাইসেন্স করলেই ব্যবসা করা যায়’—এ কথাটিও আইনসম্মত সাধারণ নিয়ম নয়।

প্রধান বিষয় হলো—সরকারি কর্মচারী ব্যবসাটির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, ব্যবসাটি কী ধরনের, তিনি গেজেটেড না নন-গেজেটেড, সংশ্লিষ্ট সার্ভিস রুল কী বলছে এবং প্রয়োজনীয় পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না।

তাই চাকরিতে থাকা অবস্থায় ব্যবসা শুরু করার আগে শুধু ট্রেড লাইসেন্স করার পরিবর্তে প্রযোজ্য আচরণবিধি দেখে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া এবং সম্পদের ঘোষণায় প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও Rule 17-এর অধীনে সরকারি কর্মচারীর চাকরির বাইরে ব্যবসা বা কাজের ক্ষেত্রে পূর্বানুমোদনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।

তথ্যসূত্র: সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং Government Servants (Conduct) Rules, 1979-এর সংশ্লিষ্ট বিধান। ব্যক্তির পদ ও দপ্তরভেদে অতিরিক্ত সার্ভিস রুল প্রযোজ্য হতে পারে; তাই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন/কর্তৃপক্ষের লিখিত মতামত নেওয়া উত্তম।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *