পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং নয়: নীতিমালা সংশোধন

সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা গ্রহণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। এখন থেকে নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং সেবা নেওয়া যাবে না। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়া যাবে। পাশাপাশি অর্থ বিভাগ অনুমোদিত বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও সেবা গ্রহণ করা যাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা-০৩ শাখা থেকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’-এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।কী পরিবর্তন হলো

সংশোধিত নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—নতুন আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্থতা থাকছে না

আগে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জনবল ও সেবা গ্রহণ করতে পারত। সংশোধনের পর নতুন সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দপ্তর সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা কিনতে পারবে

অন্যদিকে অর্থ বিভাগ অনুমোদিত বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এক নজরে সংশোধিত নিয়ম

বিষয়সংশোধিত বিধান
নতুন আউটসোর্সিংবেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া যাবে না
সরাসরি ব্যক্তিসরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়া যাবে
বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানঅর্থ বিভাগ অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা নেওয়া যাবে
পুরোনো বেসরকারি চুক্তিচুক্তির নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত বহাল থাকবে
সেবাকর্মীর পারিশ্রমিকনিজ নামের ব্যাংক হিসাব বা ব্যক্তিগত এমএফএস চ্যানেলে দিতে হবে
সেবাকর্মী পরিবর্তনসেবা ক্রয়কারীর অনুমোদন ছাড়া পরিবর্তন করা যাবে না
চুক্তির বাইরে কাজনির্ধারিত সেবার বাইরে অন্য কাজে নিয়োজিত করা যাবে না
চুক্তি ভঙ্গপাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ও রুলস অনুযায়ী ব্যবস্থা

পুরোনো চুক্তির ক্ষেত্রে কী হবে?

নতুন নিয়ম কার্যকর হলেও আগে থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল হচ্ছে না। সংশোধিত বিধানে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় যে সেবা কেনা হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট চুক্তির নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত চলতে পারবে।

অর্থাৎ, পুরোনো চুক্তি চলমান থাকলে সেটি হঠাৎ করে বন্ধ করে নতুন ব্যবস্থায় যেতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি। তবে নতুন করে চুক্তি বা নতুন সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

‘সেবা সরবরাহকারী’র সংজ্ঞায় পরিবর্তন

সংশোধনের মাধ্যমে নীতিমালায় ‘সেবা সরবরাহকারী’-এর সংজ্ঞাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, আউটসোর্সিংয়ের জন্য নির্ধারিত সেবা সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সেবা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনকারী বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সেবা সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এর ফলে নতুন ব্যবস্থায় আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকারি অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়বে।

সেবাকর্মীদের টাকা সরাসরি ব্যাংক বা এমএফএসে

সংশোধিত নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পারিশ্রমিক পরিশোধের পদ্ধতি

চুক্তিভুক্ত সেবার বিপরীতে সেবাকর্মীর প্রাপ্য অর্থ তার নিজ নামের ব্যাংক হিসাব অথবা ব্যক্তিগত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে।

এর ফলে সেবাকর্মীর পারিশ্রমিক প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আর্থিক চ্যানেল ব্যবহারের বিধান স্পষ্ট করা হয়েছে।

ইচ্ছামতো সেবাকর্মী পরিবর্তন করা যাবে না

সংশোধিত বিধানে সেবাকর্মী পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

সেবা ক্রয়কারীর অনুমোদন ছাড়া সেবা সরবরাহকারী বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো সেবাকর্মী পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে কার্যে অবহেলা, অসদাচরণসহ সুনির্দিষ্ট কারণে কোনো কর্মী পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে ‘আউটসোর্সিং সেবা পরিবীক্ষণ কমিটি’র সুপারিশের ভিত্তিতে পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

এতে সেবাকর্মী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

যে কাজে নিয়োগ, সেই কাজই করতে হবে

সংশোধিত নীতিমালায় সেবাকর্মীকে চুক্তির বাইরে অন্য কাজে নিয়োজিত করার বিষয়েও বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।

কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দপ্তর যে নির্দিষ্ট সেবার জন্য সেবা সরবরাহকারী বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি করবে, সেবাকর্মীকে সেই নির্ধারিত সেবা ছাড়া অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করা যাবে না

অর্থাৎ, একজন সেবাকর্মীকে যে কাজের জন্য আউটসোর্সিংয়ের আওতায় নেওয়া হয়েছে, প্রশাসনিক প্রয়োজনে তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজে ব্যবহার করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে।

ছুটি, প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলার বিষয় চুক্তিতে নির্ধারিত হবে

সেবাকর্মীদের ছুটি, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও অন্যান্য বিষয় সেবা ক্রয়কারী এবং সেবা সরবরাহকারী বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

এতে কর্মীদের সেবা-সংক্রান্ত বিভিন্ন শর্ত চুক্তিতে স্পষ্টভাবে নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চুক্তি ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা

সেবা সরবরাহকারী বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট সেবা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮ অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

কেন এই পরিবর্তন?

অর্থ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হলো—

  • সরকারি কাজে গতিশীলতা আনা;
  • স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো;
  • সরকারি ব্যয় কমানো;
  • মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা;
  • আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় সেবা গ্রহণ ও পারিশ্রমিক প্রদানের প্রক্রিয়া আরও সুসংগঠিত করা।

সেবাকর্মীদের জন্য এর অর্থ কী?

সংশোধনীটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব প্রভাব পড়তে পারে নতুন করে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ বা সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে। নতুন সেবা ক্রয়ের সময় বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার পথ বন্ধ হচ্ছে, আর সরাসরি ব্যক্তি অথবা অনুমোদিত বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীতিমালার সংশোধনকে সরাসরি সরকারি রাজস্ব খাতে স্থায়ী নিয়োগ বা চাকরি জাতীয়করণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা গ্রহণের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছে।

এ ছাড়া আগে থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত বহাল রাখার বিধান থাকায় পুরোনো ও নতুন ব্যবস্থার মধ্যে একটি রূপান্তরকালও রাখা হয়েছে।

সারসংক্ষেপ

নতুন নিয়মের মূল কথা হলো:
নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিং নয়; সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরাসরি ব্যক্তি অথবা অর্থ বিভাগ অনুমোদিত বিশেষায়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে সেবাকর্মীর পারিশ্রমিক নিজস্ব ব্যাংক বা এমএফএস হিসাবে দেওয়ার বিধান, কর্মী পরিবর্তনে নিয়ন্ত্রণ এবং চুক্তির বাইরে কাজে নিয়োজিত না করার নিয়ম যুক্ত হয়েছে। সংশোধিত আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

তথ্যসূত্র: অর্থ বিভাগের সংশোধিত প্রজ্ঞাপন, অর্থ বিভাগের ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ এবং ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদন। অর্থ বিভাগ ২০২৫ সালে মূল নীতিমালাটি প্রকাশ করেছিল এবং পরবর্তী সময়ে এর বাস্তবায়ন ও স্পষ্টীকরণ নিয়ে পৃথক নির্দেশনাও দিয়েছে।

Source File

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *