প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক পদ নন-গেজেটেড নয়, ১০ম গ্রেডে গেজেটেড কর্মকর্তা: মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্পষ্টীকরণ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদটি নন-গেজেটেড হিসেবে বিবেচিত হবে—এমন কোনো নির্দেশনা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ ও মন্ত্রণালয়ের নথিতে প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করে ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আপনার দেওয়া নথিতে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়-২ শাখা থেকে জারি করা আদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যমান বেতন গ্রেড উন্নীত করার পাশাপাশি তাদের পদমর্যাদার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের সম্মতির পর প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা এতদিন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে ১১তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন হলে ১২তম গ্রেডে বেতন-ভাতা পেতেন। পরবর্তী সিদ্ধান্তে প্রধান শিক্ষকদের পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১০ম গ্রেডের জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬,০০০ থেকে ৩৮,৬৪০ টাকা। এর আগে ১১তম গ্রেডের বেতনস্কেল ছিল ১২,৫০০ থেকে ৩০,২৩০ টাকা।
প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপনেও প্রধান শিক্ষক পদের বিদ্যমান ১১তম গ্রেডের বেতনস্কেল থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার সময় বন্ধনীর মধ্যে ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ উল্লেখ করা হয়েছে।
১০ম গ্রেডে প্রধান শিক্ষকদের অবস্থান
| বিষয় | আগের অবস্থা | উন্নীত অবস্থান |
|---|---|---|
| পদ | প্রধান শিক্ষক | প্রধান শিক্ষক |
| গ্রেড | ১১তম | ১০ম |
| বেতনস্কেল | ১২,৫০০–৩০,২৩০ টাকা | ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা |
| পদমর্যাদা | — | গেজেটেড কর্মকর্তা |
| আওতাভুক্ত পদ | — | প্রায় ৬৫,৫০২টি |
৬৫ হাজার ৫০২ জন প্রধান শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ৬৫ হাজার ৫০২ জন প্রধান শিক্ষকের বেতনস্কেল ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার বিষয়ে অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই সম্মতি দেয়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করে।
এরপর অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ১০ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণে সম্মতি দেয়। সেখানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের শর্ত অনুসরণ, বিদ্যমান বিধি-বিধান এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কথা বলা হয়।
কেন ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পদমর্যাদা। শুধু বেতন গ্রেড পরিবর্তন এবং গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে পদমর্যাদা পাওয়া—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে ১০ম গ্রেডের বিবরণের সঙ্গে সরাসরি ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এই নির্দিষ্ট সরকারি নথির আলোকে প্রধান শিক্ষক পদকে নন-গেজেটেড পদ হিসেবে উল্লেখ করা বিভ্রান্তিকর।
বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে গ্রেড, বেতনস্কেল ও পদমর্যাদা প্রশাসনিকভাবে আলাদা বিষয় হলেও সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষক পদের ১০ম গ্রেডের সঙ্গে গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের জন্য বিশেষ শর্ত
নতুন সিদ্ধান্তে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে। তাদের Basic Training for Primary Teachers (BTPT) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে।
আপনার দেওয়া নথিতে বলা হয়েছে, সরকারি আদেশ জারির তারিখ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের নির্ধারিত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে।
প্রকাশিত সংবাদসূত্রেও ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণের সঙ্গে প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের BTPT সম্পন্ন করার শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি কেন প্রয়োজন হয়েছিল?
কোনো সরকারি পদের বেতন গ্রেড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। এ ধরনের পরিবর্তনের সঙ্গে সাংগঠনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রভাব, নিয়োগবিধি এবং পদসংক্রান্ত অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় জড়িত থাকে।
প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার ক্ষেত্রেও কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে ছিল—
১. অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের সম্মতি
২. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি
৩. অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগের মাধ্যমে বেতনস্কেল নির্ধারণ
৪. প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন
৫. প্রয়োজনীয় নিয়োগবিধি ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা
৬. সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ জারি
এই ধারাবাহিকতার পরই ১০ম গ্রেডে প্রধান শিক্ষক পদ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়।
আদালতের রায়েরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেড ও গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা নিয়ে বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। আদালতের রায়ের পর ৪৫ জন প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে ১০ম গ্রেড ও গেজেটেড কর্মকর্তার পদমর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি কার্যকর হয়। পরবর্তী সময়ে একই অবস্থানে থাকা দেশের অন্যান্য প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
১৫ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার বিষয়
পরবর্তী প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষক পদকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর করার কথা জানানো হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের নতুন গ্রেডের বেতন-ভাতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই তারিখটি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, এটি শুধু ভবিষ্যতে গ্রেড দেওয়ার একটি প্রস্তাব নয়; প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ধাপ সম্পন্ন করে বিষয়টি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে।
তাহলে প্রধান শিক্ষকরা কি নন-গেজেটেড?
প্রাপ্ত নথিপত্রের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের ভাষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজ্ঞাপনে প্রধান শিক্ষক পদের বর্তমান গ্রেড ১১ থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার পাশাপাশি ১০ম গ্রেডের সঙ্গে ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ পদমর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এই প্রজ্ঞাপনকে ভিত্তি করে প্রধান শিক্ষক পদকে ‘নন-গেজেটেড’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাজে—যেমন নিয়োগ, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, ক্ষমতা অর্পণ, সার্ভিস বুক বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধা—‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ মর্যাদার প্রয়োগ কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিধি ও পৃথক সরকারি নির্দেশনা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই শুধু গ্রেডের তথ্য দিয়ে প্রতিটি প্রশাসনিক অধিকার বা সুবিধা নির্ধারণ করা উচিত নয়।
প্রধান শিক্ষকদের জন্য সিদ্ধান্তটির মূল দিক
সবকিছু মিলিয়ে সরকারি নথি ও পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
প্রথমত, বিদ্যমান ১১তম গ্রেড থেকে বেতন গ্রেড ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ১০ম গ্রেডের বেতনস্কেল ১৬,০০০–৩৮,৬৪০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে।
তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে ১০ম গ্রেডের সঙ্গে ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ পদমর্যাদা উল্লেখ করা হয়েছে।
শেষ কথা
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে ‘নন-গেজেটেড’ ও ‘গেজেটেড’ সংক্রান্ত যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার দেওয়া মন্ত্রণালয়ের নথিতে ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণ এবং ‘গেজেটেড কর্মকর্তা’ হিসেবে পদমর্যাদার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
সুতরাং, এই সরকারি আদেশের ভিত্তিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদকে নন-গেজেটেড বলা যায় না; বরং প্রজ্ঞাপনে ১০ম গ্রেডের সঙ্গে গেজেটেড কর্মকর্তা পদমর্যাদা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৬৫ হাজার ৫০২টি পদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে সম্পন্ন হয়েছে।



