পেনশন । লাম্পগ্র্যান্ট I পিআরএল

পেনশনারদের পেনশন হার ২০২৬: কার কত টাকা বাড়ল, নতুন হিসাবে যা জানা গেল

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ কার্যকরের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্যও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি স্ল্যাবে ৫৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বাড়ানোর বিধান করা হয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তরা শতাংশের হিসাবে বেশি সুবিধা পাবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন পেনশন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। পেনশন পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে একজন পেনশনভোগী যে নিট পেনশন পেতেন, সেই অঙ্ককে।

পাঁচ স্ল্যাবে পেনশন বৃদ্ধি

নতুন কাঠামোয় পেনশনভোগীদের ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে পাঁচটি শ্রেণি করা হয়েছে।

১. নিট পেনশন ৯,০০০ টাকা বা কম

যাঁরা ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে মাসে ৯,০০০ টাকা বা তার কম নিট পেনশন পেতেন, তাঁদের পেনশন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ।

এই শ্রেণিতে নতুন নিট পেনশনের সর্বনিম্ন পরিমাণ ১০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৮,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, কারও নিট পেনশন ৯,০০০ টাকা হলে তা বেড়ে ১৮,০০০ টাকা হতে পারে। এতে মাসে সর্বোচ্চ ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি হবে।

২. নিট পেনশন ৯,০০১ থেকে ২০,০০০ টাকা

এই শ্রেণির পেনশনভোগীদের জন্য বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ শতাংশ।

নতুন কাঠামোয় এ শ্রেণির নিট পেনশনের সীমা ১৮,০০১ টাকা থেকে ৩৫,০০০ টাকা।

উদাহরণ হিসেবে, কারও বর্তমান নিট পেনশন ১০,০০০ টাকা হলে ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে নতুন অঙ্ক দাঁড়াবে ১৭,৫০০ টাকা। আবার ২০,০০০ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তি ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে ৩৫,০০০ টাকা পাবেন।

৩. নিট পেনশন ২০,০০১ থেকে ৩০,০০০ টাকা

এই স্ল্যাবে পেনশন বাড়বে ৬৫ শতাংশ।

নতুন কাঠামোয় এ শ্রেণির নিট পেনশন ৩৫,০০১ টাকা থেকে ৪৯,০০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

যেমন, ২৫,০০০ টাকা নিট পেনশন পাওয়া একজন পেনশনভোগীর ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি হলে নতুন পেনশন হবে ৪১,২৫০ টাকা। অর্থাৎ মাসে বৃদ্ধি হবে ১৬,২৫০ টাকা।

৩০,০০০ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি হলে হিসাব দাঁড়ায় ৪৯,৫০০ টাকা; তবে প্রজ্ঞাপনে এ শ্রেণির সর্বোচ্চ সীমা ৪৯,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই চূড়ান্ত পেনশন নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট স্ল্যাবের সীমা ও প্রজ্ঞাপনের বিধান অনুসরণ করতে হবে।

৪. নিট পেনশন ৩০,০০১ থেকে ৪০,০০০ টাকা

এই শ্রেণিতে পেনশন বৃদ্ধির হার ৬০ শতাংশ।

নতুন নিট পেনশনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯,০০১ টাকা থেকে ৬২,০০০ টাকা।

উদাহরণ হিসেবে, ৩৫,০০০ টাকা নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তির ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে নতুন পেনশন দাঁড়ায় ৫৬,০০০ টাকা। অর্থাৎ মাসে বাড়বে ২১,০০০ টাকা।

৪০,০০০ টাকা নিট পেনশন হলে ৬০ শতাংশ হিসাবে বৃদ্ধি হবে ২৪,০০০ টাকা এবং হিসাব দাঁড়াবে ৬৪,০০০ টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট স্ল্যাবে সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৬২,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে শুধু শতাংশের হিসাব নয়, প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমাও বিবেচনায় নিতে হবে।

৫. নিট পেনশন ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি

যাঁরা ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পেতেন, তাঁদের জন্য বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ শতাংশ।

এই শ্রেণিতে নতুন নিট পেনশনের সর্বনিম্ন সীমা ৬২,০০১ টাকা এবং সর্বোচ্চ সীমা ৭০,২০০ টাকা।

অর্থাৎ, এই শ্রেণির ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির বিধান থাকলেও নতুন পেনশন ৭০,২০০ টাকার বেশি হবে না।

এক নজরে নতুন পেনশন কাঠামো

৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনবৃদ্ধির হারনতুন নিট পেনশনের সীমা
৯,০০০ টাকা বা কম১০০%১০,০০০–১৮,০০০ টাকা
৯,০০১–২০,০০০ টাকা৭৫%১৮,০০১–৩৫,০০০ টাকা
২০,০০১–৩০,০০০ টাকা৬৫%৩৫,০০১–৪৯,০০০ টাকা
৩০,০০১–৪০,০০০ টাকা৬০%৪৯,০০১–৬২,০০০ টাকা
৪০,০০১ টাকা বা বেশি৫৫%৬২,০০১–৭০,২০০ টাকা

সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই পাঁচটি স্ল্যাবের হার ও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন?

নতুন কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যাঁদের নিট পেনশন কম, তাঁদের জন্য শতাংশের হিসাবে বেশি বৃদ্ধি রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ দীর্ঘদিন আগে অবসরে গিয়ে বর্তমানে কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে তুলনামূলক বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য হার ধীরে ধীরে কমে ৫৫ শতাংশে নেমেছে।

সরকার নতুন ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (OROP) ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও জানিয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে বড় ধরনের আর্থিক সংশ্লেষ এবং পুরোনো অবসরপ্রাপ্তদের তথ্যসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যবর্তী সময়ে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা

নতুন কাঠামোয় সর্বোচ্চ নিট পেনশন ৭০,২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যেসব বিদ্যমান পেনশনভোগী ইতোমধ্যে ৭০,২০০ টাকার বেশি নিট পেনশন তুলছেন, তাঁদের পেনশন তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে ৭০,২০০ টাকা করা হবে না। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাঁরা ১ জুলাই ২০২৭ তারিখে পরবর্তী বার্ষিক বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান নিট পেনশন পাবেন।

সর্বনিম্ন পেনশন কত?

নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন স্ল্যাবের ক্ষেত্রেও নতুন ন্যূনতম নিট পেনশন ১০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে ৯,০০০ টাকা বা তার কম পেনশন পাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি একই হারে দ্বিগুণ অঙ্ক পাবেন—এভাবে সরলভাবে হিসাব করা যাবে না। কারণ প্রজ্ঞাপনে সংশ্লিষ্ট স্ল্যাবের ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই ব্যক্তিভেদে চূড়ান্ত পেনশন নির্ধারণের সময় প্রজ্ঞাপনের নির্ধারিত সীমা অনুসরণ করতে হবে।

৩০ জুনের নিট পেনশনই হবে মূল ভিত্তি

পেনশন বৃদ্ধির হিসাব বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ হলো ৩০ জুন ২০২৬।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ওই তারিখে একজন অবসরভোগী বা আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগী যে নিট পেনশন পেতেন, সেটিকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামোয় নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণ করা হবে।

ফলে বর্তমানে কেউ কত টাকা পেনশন তুলছেন—শুধু সেটি জানলেই সব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নতুন পেনশন নির্ণয় করা যাবে না; তাঁর ৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশন এবং সংশ্লিষ্ট স্ল্যাব জানতে হবে।

গ্রস পেনশনের হার অপরিবর্তিত

নতুন কাঠামোয় শুধু নিট পেনশন বৃদ্ধির বিধানই নয়, অবসরকালীন অন্যান্য সুবিধার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল ৫ থেকে ২৫ বছর এবং গ্রস পেনশন নির্ধারণের হার সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ২১ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ—এই প্রচলিত কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ৫ বছর চাকরির ক্ষেত্রে গ্রস পেনশন ২১ শতাংশ এবং ২৫ বছর বা তার বেশি চাকরিকালে ৯০ শতাংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হবে।

ছুটি নগদায়নের সুবিধাও বহাল

অবসরকালে অর্জিত ছুটি পাওনা থাকলে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ছুটি নগদায়ন হিসেবে পাওয়ার বিধানও বহাল রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ নতুন পে স্কেলে পেনশনের পাশাপাশি অবসরকালীন ছুটি নগদায়নের বিদ্যমান সুবিধাও বজায় থাকছে।

আজীবন পারিবারিক পেনশনেও বিধান

মৃত সরকারি কর্মচারীর বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামীর আজীবন পারিবারিক পেনশনের বিধানও বহাল রাখা হয়েছে। পুনর্বিবাহ না করার শর্তে তাঁরা আজীবন পারিবারিক পেনশন পাবেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পারিবারিক পেনশন ভোগকালে পুনর্বিবাহ করেননি—এ মর্মে বছরে একবার অঙ্গীকারনামা বা প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে দিতে হবে। তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সী বিধবার ক্ষেত্রে এই প্রত্যয়ন দেওয়ার শর্ত প্রযোজ্য হবে না।

পেনশন বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য কী?

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য তুলনামূলক বেশি শতাংশে বৃদ্ধি।

অর্থাৎ একই হারে সবার পেনশন বাড়ানো হয়নি। বরং যাঁদের বর্তমান নিট পেনশন কম, তাঁদের জন্য ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি রাখা হয়েছে; পেনশন যত বেশি, বৃদ্ধির হার তত কমে ৫৫ শতাংশে এসেছে।

সরকারের নতুন জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ সামগ্রিকভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীকে প্রভাবিত করবে বলে জানানো হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে এবং কর্মরত কর্মচারীদের পাশাপাশি পেনশনভোগীদের সুবিধাও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

শেষ কথা

সুতরাং ২০২৬ সালের নতুন পেনশন কাঠামোয় একজন পেনশনারের কত টাকা বাড়বে তা নির্ভর করবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর নিট পেনশন কত ছিল তার ওপর। ৯,০০০ টাকা বা কম নিট পেনশনে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ, ৯,০০১–২০,০০০ টাকায় ৭৫ শতাংশ, ২০,০০১–৩০,০০০ টাকায় ৬৫ শতাংশ, ৩০,০০১–৪০,০০০ টাকায় ৬০ শতাংশ এবং ৪০,০০১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির বিধান করা হয়েছে।

তবে চূড়ান্ত নতুন পেনশন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু শতাংশ দিয়ে গুণ করলেই হবে না; প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ সীমাও বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে সর্বোচ্চ নিট পেনশনের সীমা ৭০,২০০ টাকা হওয়ায় বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে আলাদা বিধান প্রযোজ্য হবে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *