জমির জাল দলিল বাতিল করবেন যেভাবে: জানুন আইনি প্রক্রিয়া ও শাস্তি
বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের একটি বড় অংশ দখল করে আছে জাল বা ভুয়া দলিলের সমস্যা। প্রতারক চক্র বিভিন্ন সময়ে অন্যের জমি নিজেদের দাবি করতে ভুয়া দলিল তৈরি করে। তবে ভুক্তভোগীদের আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, জাল দলিল বাতিল এবং দোষীদের শাস্তির বিধান রয়েছে।
প্রথমে প্রয়োজন দলিল যাচাই
সন্দেহজনক কোনো দলিলের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে সবার আগে সেটির সত্যতা যাচাই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। দলিলের ক্রমিক নম্বর, ভলিউম নম্বর এবং তারিখ মিলিয়ে দেখলেই বোঝা সম্ভব দলিলটি আসল নাকি নকল। মূল ভলিউম বইয়ে যদি দলিলের তথ্যের মিল না থাকে, তবে নিশ্চিতভাবে সেটি জাল দলিল হিসেবে গণ্য হবে।
দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার
দলিলটি জাল প্রমাণিত হলে ভুক্তভোগীকে দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের আওতায় আদালতে ‘ঘোষণামূলক মামলা’ (Declaration Suit) দায়ের করতে হবে। এই মামলার মাধ্যমে আদালতকে জানাতে হবে যে, ওই দলিলটি প্রতারণামূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং তা বাতিলযোগ্য। আদালতের রায়ের মাধ্যমে দলিলটি বাতিল ঘোষিত হলে সেই রায় সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দিয়ে সরকারি রেকর্ড সংশোধন (Update) করতে হবে।
ফৌজদারি মামলা ও শাস্তি
শুধু দলিল বাতিলই নয়, যারা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব। ভুক্তভোগী চাইলে দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি আদালতে মামলা করতে পারেন।
আইন অনুযায়ী, জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহারের অপরাধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৪৭১ ধারায় মামলা করা যায়। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রতারক চক্রের সদস্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
-
ধারা ৪২০: প্রতারণার জন্য শাস্তি।
-
ধারা ৪৬৭ ও ৪৬৮: দলিল জালিয়াতি ও প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতির শাস্তি।
-
ধারা ৪৭১: জেনে-শুনে জাল দলিল খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা।
সতর্কবার্তা
আইনজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, জাল দলিল তৈরি করা বা জেনে-শুনে তা ব্যবহার করা একটি গুরুতর অপরাধ। তাই জমি কেনা-বেচার আগে বা মালিকানা নিয়ে কোনো সন্দেহ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক সময়ে আইনি পদক্ষেপ নিলে নিজের সম্পদ রক্ষা করা এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
জাল দলিল তৈরি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে মামলা করার জন্য একটি নালিশি দরখাস্ত বা সি.আর (C.R.) মামলার নমুনা নিচে দেওয়া হলো।
সতর্কীকরণ: এটি কেবল একটি খসড়া বা নমুনা কাঠামো। আদালতে মামলা দায়ের করার জন্য আপনাকে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর (Advocate) সহায়তা নিতে হবে, যিনি আপনার ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত আরজি তৈরি করবেন।
নমুনা নালিশি দরখাস্ত (ফৌজদারি)
বিজ্ঞ চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট/মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, [জেলার নাম]
মামলা নং: ……………../২০২৫ (আদালত পূরণ করবেন)
বাদী/ফরিয়াদী: নাম: [আপনার নাম] পিতা: [পিতার নাম] সাং: [আপনার ঠিকানা] থানা: [থানার নাম], জেলা: [জেলার নাম]
বনাম
আসামীগণ: ১. নাম: [মূল আসামীর নাম] পিতা: [পিতার নাম] সাং: [ঠিকানা]
২. নাম: [সহযোগীর নাম, যদি থাকে] পিতা: [পিতার নাম] সাং: [ঠিকানা]
৩. নাম: [দলিল লেখকের নাম বা অন্য সহযোগী] সাং: [ঠিকানা]
সাক্ষীগণ: ১. [সাক্ষীর নাম ও ঠিকানা] ২. [সাক্ষীর নাম ও ঠিকানা] ৩. [সাক্ষীর নাম ও ঠিকানা]
ঘটনার তারিখ ও সময়: [যে তারিখে আপনি জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পেরেছেন] ঘটনাস্থল: [যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল হয়েছে বা যেখানে জমিটি অবস্থিত] ধারা: দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ও ১০৯ ধারা।
বিষয়: উপরোক্ত আসামীদের বিরুদ্ধে জাল দলিল সৃজন ও প্রতারণার অভিযোগ।
জনাব, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী বাদী আপনার আদালতের এখতিয়ারাধীন এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা ও শান্তিপ্রিয় নাগরিক।
১. নালিশি তফসিলভুক্ত সম্পত্তিটি আমার পৈত্রিক/ক্রয়সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি। আমি দীর্ঘদিন যাবৎ উক্ত জমি ভোগদখল করে আসছি এবং নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করছি।
২. আসামীগণ অত্যন্ত লোভী, পরসম্পদলোভী এবং প্রতারক প্রকৃতির লোক। তারা দীর্ঘদিন ধরে আমার উক্ত সম্পত্তি গ্রাস করার পাঁয়তারা করে আসছিল।
৩. গত ইং [তারিখ] তারিখে আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি যে, ১ নং আসামী, ২ ও ৩ নং আসামীর যোগসাজশে আমার অগোচরে এবং আমার স্বাক্ষর জাল করে [সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম] অফিসে একটি ভুয়া ও জাল সাফ-কবলা/হেবা দলিল (দলিল নং- ……, তারিখ- ……) রেজিস্ট্রি করেছে।
৪. পরবর্তীতে আমি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে তল্লাশি দিয়ে উক্ত দলিলের সার্টিফাইড কপি উত্তোলন করে নিশ্চিত হই যে, আসামীরা অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেদের লাভবান করার জন্য এবং আমার ক্ষতি করার মানসে এই জাল দলিলটি সৃজন করেছে। উক্ত দলিলে দাতা হিসেবে আমার নাম ব্যবহার করা হলেও আমি কখনও সেই দলিলে স্বাক্ষর বা টিপসই প্রদান করিনি।
৫. আসামীরা উক্ত জাল দলিলটি খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে নামজারি বা জমি দখলের চেষ্টা করছে, যা দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ।
৬. এমতাবস্থায়, আমি গত ইং [তারিখ] তারিখে আসামীদের কাছে উক্ত জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে তারা আমাকে গালিগালাজ করে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
প্রার্থনা: অতএব, হুজুর সমীপে আকুল প্রার্থনা এই যে, উপরোক্ত বিষয়টি আমলে নিয়ে আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে বা সমন প্রদান করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মর্জি হয়।
তফসিল পরিচয় (জমির বিবরণ): জেলা: …………, থানা: …………, মৌজা: ………… খতিয়ান নং: …………, দাগ নং: ………… জমির পরিমাণ: ………… শতাংশ/কাঠা।
সত্যপাঠ: আমি হলফপুবর্ক ঘোষণা করছি যে, অত্র আরজিতে বর্ণিত যাবতীয় তথ্য আমার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য ও সঠিক।
স্বাক্ষর [আপনার নাম] তারিখ: …………
পরবর্তী করণীয়:
১. দলিল সংগ্রহ: আসল দলিল এবং জাল দলিলের (সার্টিফাইড কপি) ফটোকপি সংগ্রহ করুন। ২. আইনজীবী নিয়োগ: এই ড্রাফটটি নিয়ে একজন ফৌজদারি আইনজীবীর সাথে কথা বলুন। তিনি এতে প্রয়োজনীয় আইনি ধারা এবং ঘটনার বিস্তারিত আরও নিখুঁতভাবে যুক্ত করবেন। ৩. দেওয়ানি মামলা: মনে রাখবেন, এই মামলাটি অপরাধীদের শাস্তির জন্য। কিন্তু দলিলটি সরকারিভাবে বাতিল করার জন্য আপনাকে দেওয়ানি আদালতে আলাদাভাবে “Declaration Suit” (ঘোষণামূলক মামলা) করতে হবে।
জাল দলিল করার শাস্তি কি?
জাল দলিল তৈরি করা বা ব্যবহার করা বাংলাদেশের আইনে একটি গুরুতর অপরাধ, যার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। প্রধানত দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর কয়েকটি ধারায় এই অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।
জাল দলিল করার জন্য প্রযোজ্য প্রধান ধারা এবং তাদের শাস্তি:
১. দণ্ডবিধি ধারা ৪৬৩ (Forgery): * জালিয়াতির সংজ্ঞা: কোনো দলিল বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড মিথ্যাভাবে তৈরি করা, বা কোনো মিথ্যা দলিল বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড (যার দ্বারা কোনো অধিকার বা দাবি সৃষ্টি হয় বা বিলোপ করা হয়) তৈরি করা। * শাস্তি: এই ধারার অধীনে সরাসরি কোনো শাস্তির কথা বলা না থাকলেও, এর পরের ধারাগুলোতে এর সাথে সম্পর্কিত অপরাধের জন্য শাস্তির উল্লেখ আছে।
২. দণ্ডবিধি ধারা ৪৬৫ (Punishment for forgery): * যদি কোনো ব্যক্তি জালিয়াতি করে, তবে সে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
৩. দণ্ডবিধি ধারা ৪৬৭ (Forgery of valuable security, will, etc.): * যখন জাল দলিলটি কোনো মূল্যবান সম্পত্তি (যেমন: জমি), উইল, বা কোনো স্বীকৃতিপত্র তৈরি বা হস্তান্তরের সাথে জড়িত থাকে, তখন এটি আরও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। * শাস্তি: এই ক্ষেত্রে অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। জাল দলিল তৈরির ক্ষেত্রে এই ধারাটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হয়।
৪. দণ্ডবিধি ধারা ৪৬৮ (Forgery for purpose of cheating): * যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি করে, অর্থাৎ জাল দলিলটি ব্যবহার করে কাউকে ঠকানোর বা প্রতারণা করার উদ্দেশ্য থাকে। * শাস্তি: এই ক্ষেত্রে অপরাধীর ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।
৫. দণ্ডবিধি ধারা ৪৭১ (Using as genuine a forged document or electronic record): * যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির দ্বারা তৈরি জাল দলিলকে (যা সে জাল বলে জানে বা বিশ্বাস করার কারণ আছে) খাঁটি বা আসল হিসেবে ব্যবহার করে। * শাস্তি: যে অপরাধের জন্য দলিলটি জাল করা হয়েছিল, সেই অপরাধের জন্য যে শাস্তি, এই ধারায় একই শাস্তি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, যদি জাল দলিলটি ৪৬৭ ধারার অধীন হয় (যেমন: জমি সংক্রান্ত), তাহলে ৪৭১ ধারায় অপরাধীর যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে।
৬. দণ্ডবিধি ধারা ৪২০ (Cheating and dishonestly inducing delivery of property): * যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণা করে কাউকে কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচিত করে, অর্থাৎ জাল দলিলের মাধ্যমে জমি বা অন্য কোনো সম্পত্তি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করে। * শাস্তি: ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা।
৭. দণ্ডবিধি ধারা ১০৯ (Punishment of abetment if the act abetted is committed in consequence and where no express provision is made for its punishment): * যদি কেউ জাল দলিল তৈরির কাজে সহযোগিতা করে বা প্ররোচনা দেয় (যেমন: দলিল লেখক, সাক্ষী ইত্যাদি)। * শাস্তি: যে অপরাধের জন্য প্ররোচনা দেওয়া হয়েছিল, সেই অপরাধের জন্য যে শাস্তি, এই ধারায় প্ররোচনাকারীর একই শাস্তি হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
-
এই অপরাধগুলো আমলযোগ্য (Cognizable) এবং জামিন অযোগ্য (Non-bailable)।
-
জাল দলিল সম্পর্কিত মামলার ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলা করার পাশাপাশি ফৌজদারি আদালতে অপরাধীদের শাস্তির জন্য মামলা করা যায়।
সুতরাং, জাল দলিল তৈরি ও ব্যবহারের পরিণাম অত্যন্ত গুরুতর, এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে।


