সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

নবম পে-স্কেল ২০২৫ । গেজেট প্রকাশের আল্টিমেটাম, আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি সরকারি কর্মচারীদের

দীর্ঘ দশ বছর পর নতুন বেতনকাঠামো বা নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশের দাবিতে কঠোর অবস্থানে গেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠন আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে গেজেট প্রকাশের জন্য সরকারের কাছে আল্টিমেটাম দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ১৭ ডিসেম্বর থেকে নতুন ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

🚨 মূল দাবি ও আল্টিমেটাম

সাম্প্রতিক মহাসমাবেশ থেকে ‘সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর নেতারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন, যার মধ্যে প্রধান হলো:

  • গ্রেড সংখ্যা হ্রাস: বর্তমানে প্রচলিত ২০টি গ্রেড কমিয়ে ১:৪ অনুপাতের ভিত্তিতে ১২টি গ্রেডে নতুন বেতন স্কেল নির্ধারণ করতে হবে।

  • সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন: ১২টি গ্রেডের মধ্যে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৩৫,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১,৪০,০০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে।

  • কার্যকর তারিখ: ৯ম পে-স্কেল জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে কার্যকর করতে হবে।

  • অন্যান্য দাবি: ২০১৫ সালের পে-স্কেলে বাতিল হওয়া টাইম স্কেলসিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল করা, গ্রাচুইটি/আনুতোষিকের হার ৯০ শতাংশের বদলে ১০০ শতাংশ নির্ধারণ করা এবং পেনশন গ্রাচুইটি ১ টাকার সমান ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা।

কর্মচারীরা বলছেন, ২০১৫ সালের পর বেতন বৃদ্ধি না হওয়ায় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমে গেছে, ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে বলেও তারা অভিযোগ করেন।

⚖️ সরকারের অবস্থান ও উদ্যোগ

চলমান পরিস্থিতিতে সরকার গত ২৪ জুলাই সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে পে কমিশন গঠন করেছে। এই কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময় দেওয়া হয়েছে।

তবে কর্মচারীদের দ্রুত গেজেট প্রকাশের আল্টিমেটাম প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, “পে স্কেল ঘোষণা করা সহজ কাজ নয়, অনেকগুলো বিষয় জড়িত। কর্মচারীদের আল্টিমেটামের মধ্যে এতো কম সময়ে ঘোষণা করা সম্ভব হবে না। আমরা কাজ করছি।”

অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে দ্রুত পে-স্কেল কার্যক্রম শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে সরকারি কর্মচারীরা আন্দোলনে নামতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকেই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সরকারি কর্মচারীদের এই আল্টিমেটাম এবং সরকারের পে-স্কেল সংক্রান্ত তৎপরতা এখন দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের পর সরকারি কর্মচারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে দেশের কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতি।

সচিবালয় ভাতা নাকি ৯ম পে স্কেল কোনটি গুরুত্বপূর্ণ?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এবং সরকারি কর্মচারীদের বর্তমান আন্দোলন ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এর জবাব হলো— নবম পে-স্কেলই (9th Pay Scale) বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং কাঙ্ক্ষিত।

সচিবালয় ভাতা নিয়ে চলমান দাবি ও আন্দোলন থাকলেও, বেশিরভাগ কর্মচারী সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি একটি আংশিক এবং বৈষম্য সৃষ্টিকারী সুবিধা।

নিচে এই দুটির তুলনামূলক গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:


⚖️ নবম পে-স্কেল বনাম সচিবালয় ভাতা: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বৈশিষ্ট্য নবম পে-স্কেল (9th Pay Scale) সচিবালয় ভাতা (Secretariat Allowance)
ক্ষেত্র সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রযোজ্য। এটি একটি জাতীয় বেতন কাঠামো। শুধুমাত্র সচিবালয়ের (ও কিছু ক্ষেত্রে সীমিত সংখ্যক অধিদপ্তর) কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য।
প্রকৃতি এটি সম্পূর্ণ বেতন কাঠামো পরিবর্তন করে। এর মাধ্যমে মূল বেতন, গ্রেড সংখ্যা (কমানোর দাবি), টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড (পুনর্বহালের দাবি), চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ভাতাসহ সব সুবিধা একযোগে বৃদ্ধি পায়। এটি একটি বিশেষ ভাতা, যা কেবল বেতনের মূল অংশের অতিরিক্ত হিসাবে যুক্ত হয় (যেমন: বর্তমানে ২০% বা দুদকের মতো ৩০% ঝুঁকি ভাতার দাবি)।
বৈষম্য এই স্কেলের মূল লক্ষ্য হলো সকল সরকারি কর্মচারীর মধ্যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূর করা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করা। এটি কার্যকর হলে সচিবালয়ের বাইরে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র বৈষম্য সৃষ্টি হবে, কারণ তারা একই অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন না।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুবিধা নিশ্চিত করে। এটি পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও ভবিষ্যতের অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এটি একটি অস্থায়ী/নির্দিষ্ট সময়ের সুবিধা, যা কর্মচারীর সার্বিক আর্থিক ভিত্তিকে নতুন স্কেলের মতো শক্তিশালী করে না।

🎯 কর্মচারী ও বিশেষজ্ঞদের মতে কেন নবম পে-স্কেল গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলো একযোগে দাবি জানাচ্ছে যে:

  1. পে-স্কেল হলো মূল সমাধান: গত ২০১৫ সাল থেকে নতুন বেতন স্কেল না হওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির তুলনায় সকল কর্মচারীর প্রকৃত আয় কমে গেছে। এই সমস্যা কেবল একটি বিশেষ ভাতা দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

  2. বৈষম্য বৃদ্ধি: একটি বিশেষ অঞ্চলের (সচিবালয়) কর্মচারীদের জন্য ভাতা দেওয়া হলে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও অন্যান্য দপ্তরের কর্মচারীরা চরমভাবে বঞ্চিত হবেন এবং তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়বে।

  3. কাঠামোগত পরিবর্তন: পে-স্কেল মূলত গ্রেড সংখ্যা কমিয়ে বেতন অনুপাত (যেমন ১:৪) ন্যায্য করার দাবি নিয়ে আসে, যা বেতন বৈষম্য দূরীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ।

সারসংক্ষেপ: সচিবালয় ভাতা কিছু সংখ্যক কর্মচারীর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু নবম পে-স্কেল হলো দেশব্যাপী সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি, ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার মূল ও একমাত্র পথ। একারণেই নবম পে-স্কেলের দাবিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *