গ্রামীণ ব্যাংক কর্মীদের জন্য নতুন বছরের উপহার: বেসিকের সমপরিমাণ ‘উদ্দীপন ভাতা’ প্রদানের ঘোষণা?
নতুন বছরের শুরুতেই কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকের সাফল্য এবং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সকল স্তরের স্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ‘উদ্দীপন ভাতা’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি, ২০২৬) গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে এক অফিস আদেশের (অফিস অর্ডার নং-০৪/২০২৬) মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরদার আকতার হামিদ স্বাক্ষরিত এই আদেশে ভাতার পরিমাণ ও যোগ্যতার বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।
ভাতার হার ও যোগ্যতাসমূহ:
অফিস আদেশ অনুযায়ী, দুই ধরনের কর্মীরা এই ভাতার আওতায় আসবেন:
স্কেলভুক্ত স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী: গ্রামীণ ব্যাংকে কর্মরত সকল নিয়মিত স্কেলভুক্ত কর্মী ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে আহরিত তাদের মূল বেতনের (এক মাসের) সমপরিমাণ অর্থ উদ্দীপন ভাতা হিসেবে পাবেন।
চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা-কর্মচারী: চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কর্মীরা ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে আহরিত তাদের সর্বসাকুল্যে বেতনের ৫০% অর্থ উদ্দীপন ভাতা হিসেবে পাবেন।
লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, “সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের বছর” হিসেবে ২০২৫ সাল সফলভাবে সম্পন্ন করার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কর্মীদের উৎসাহিত করা এবং “শুদ্ধাচার পরিপালনের মাধ্যমে অগ্রগতির বছর ২০২৬” এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই ভাতা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে যে, এই উদ্দীপন ভাতার মাধ্যমে কর্মীরা আরও উজ্জীবিত হবেন এবং ২০২৬ সালের শুরু থেকেই আমানত ও আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংকের লাভের ধারা অব্যাহত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে অফিস আদেশে নিশ্চিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এই আদেশের অনুলিপি সকল জোনাল ম্যানেজার, এরিয়া ম্যানেজার এবং শাখা ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

সরকারি কর্মচারীদের উদ্দীপন ভাতা কেন দেওয়া হয় না?
সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের মতো ‘উদ্দীপন ভাতা’ বা করপোরেট স্টাইলের ‘ইনসেনটিভ বোনাস’ সরাসরি না থাকার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত এবং নীতিগত কারণ রয়েছে। তবে সরকার মাঝেমধ্যে ভিন্ন নামে (যেমন: বিশেষ সুবিধা বা মহার্ঘ ভাতা) কর্মীদের আর্থিক সহায়তা দেয়। সরকারি কর্মচারীদের কেন সাধারণ অর্থে ‘উদ্দীপন ভাতা’ দেওয়া হয় না, তার মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. লাভ-ক্ষতির হিসেব (Profit-Loss Mechanism)
গ্রামীণ ব্যাংক বা অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বার্ষিক মুনাফার একটি অংশ কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে। একে ‘ইনসেনটিভ বোনাস’ বা ‘উদ্দীপন ভাতা’ বলা হয়। সরকারি দপ্তরগুলো (যেমন: সচিবালয়, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য বিভাগ) মূলত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান, লাভ করা এদের লক্ষ্য নয়। তাই মুনাফার ভিত্তিতে বোনাস দেওয়ার কোনো সুযোগ এখানে নেই।
২. বেতন কাঠামোর ভিন্নতা (Fixed Pay Scale)
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা নিয়ন্ত্রিত হয় ‘জাতীয় বেতন স্কেল’ (National Pay Scale) অনুযায়ী। এই স্কেলে উৎসব ভাতা (ঈদ/পূজা), বৈশাখী ভাতা এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট নির্ধারিত থাকে। এর বাইরে আলাদা কোনো বোনাস দেওয়ার আইনি কাঠামো বর্তমানে নেই।
৩. বাজেটের সীমাবদ্ধতা ও বিশাল কর্মীবাহিনী
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৫-১৬ লাখ। সামান্য পরিমাণ ভাতা বাড়ালেও সরকারের বাজেটে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক সময় সরকার চাইলেও অতিরিক্ত ভাতা দিতে পারে না।
৪. ‘বিশেষ সুবিধা’ বা প্রণোদনা (Special Incentives)
সরকার ‘উদ্দীপন ভাতা’ সরাসরি না দিলেও মাঝেমধ্যে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেয়। যেমন:
২০২৩ সাল থেকে সরকার সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৫% বিশেষ সুবিধা (Special Incentive) চালু করেছে।
সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে এই সুবিধা বাড়িয়ে গ্রেড ১০-২০ এর জন্য ১৫% এবং গ্রেড ১-৯ এর জন্য ১০% করার কথা বলা হয়েছে। এটি মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে এক ধরণের উদ্দীপন বা সহায়তা।
৫. শুদ্ধাচার ও দক্ষতা পুরস্কার
সরাসরি টাকা না দিলেও সরকার এখন ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার’ (Integrity Award) প্রদান করে। যারা কাজে বিশেষ দক্ষতা ও সততা দেখান, তাদের এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ও সনদ দেওয়া হয়, যা এক ধরণের প্রণোদনা।
সংক্ষেপে: করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা থেকে বোনাস দেয়, কিন্তু সরকারি অর্থায়ন আসে জনগণের ট্যাক্স থেকে। তাই ঢালাওভাবে বোনাস না দিয়ে সরকার বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে বা বিশেষ আর্থিক সুবিধা দিয়ে সমন্বয় করার চেষ্টা করে।



