দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন ২০২৬ : বিচার ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের গেজেট প্রকাশ
বাংলাদেশের দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘দেওয়ানি কার্যবিধি (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ এর গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে এই আইনটি জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করা হয়। এই সংশোধনীগুলো মূলত ১৯০৮ সালের মূল ‘Code of Civil Procedure’ (Act No. V of 1908) এর বিভিন্ন ধারা ও আদেশে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।
সংশোধনীর প্রধান দিকগুলো:
১. এফিডেভিটের মাধ্যমে সাক্ষ্যদান (ধারা ২৬ ও আদেশ XVIII): নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, এখন থেকে আরজি বা জবাবের সকল তথ্য এফিডেভিট বা হলফনামার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। আগে আদালতে দাঁড়িয়ে মৌখিক জবানবন্দি দেওয়ার যে প্রথা ছিল, তা কমিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করা হয়েছে। তবে জেরা এবং পুনঃজেরা আগের মতোই মৌখিকভাবে পরিচালিত হবে।
২. ডিজিটাল সমন জারি (আদেশ V): সমন জারির ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। এখন থেকে প্রথাগত পদ্ধতির পাশাপাশি SMS (Short Message Service), ভয়েস কল এবং ইন্সট্যান্ট মেসেজিং সার্ভিস (যেমন: WhatsApp বা ইমেইল) এর মাধ্যমে সমন বা দাপ্তরিক নথিপত্র প্রেরণ করা যাবে। এই সেবার প্রমাণ বা ডেলিভারি রিপোর্ট আদালতের নথিতে সংরক্ষিত থাকবে।
৩. জরিমানা বৃদ্ধি (ধারা ৩৫ক): মিথ্যা বা হয়রানিমূলক মামলার ক্ষেত্রে আদালত যে আর্থিক দণ্ড আরোপ করতে পারতেন, তার পরিমাণ ২০,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০,০০০ টাকা করা হয়েছে। এতে করে অহেতুক মামলা দায়েরের প্রবণতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
৪. নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা (ধারা ৫৬ ও ৫৭): ধারা ৫৬ সংশোধন করে বলা হয়েছে, শুধু সাধারণ নারীই নয়, বরং বৃদ্ধ, অক্ষম, অন্তঃসত্ত্বা বা দুগ্ধদানকারী মায়েদের দেওয়ানি কারাগারে আটক করা যাবে না। এছাড়া ধারা ৫৭ বিলুপ্ত করার মাধ্যমে বৈষম্যমূলক কিছু বিধান রহিত করা হয়েছে।
৫. মামলার মুলতবি সীমিতকরণ (আদেশ XVII): মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে মুলতবি (Adjournment) প্রদানের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আগে যেখানে ছয়বার মুলতবির সুযোগ ছিল, এখন তা কমিয়ে সর্বোচ্চ চারবারে নামিয়ে আনা হয়েছে।
৬. ডিক্রি জারিতে প্রশাসনিক সহযোগিতা (ধারা ৯৪ক): আদালতের কোনো ডিক্রি বা আদেশ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য আদালত এখন সরাসরি নির্বাহী কর্তৃপক্ষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দাখিল করতে হবে।
৭. অর্থের বিনিময়ে ডিক্রি জারিতে বিশেষ বিধান (আদেশ XXI): টাকা আদায়ের ডিক্রি জারির ক্ষেত্রে যদি দেনাদার টাকা পরিশোধ না করেন, তবে আদালত তাকে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখতে পারবেন। তবে দেনাদার যদি মোট পাওনার ২৫% জমা দিয়ে বন্ড সই করেন, তবে তাকে মুক্তি দেওয়া হবে। অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই আটকের নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
৮. আপিল ও শুনানি সংক্রান্ত নিয়ম: আদেশ XLI এর সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো আপিল একই নিয়মের অধীনে একাধিকবার পুনর্বিচার (Re-heard) করা যাবে না। এছাড়া কোনো পক্ষ উপস্থিত না থাকলেও রেকর্ডপত্র পর্যাপ্ত হলে আদালত গুণাগুণের ভিত্তিতে রায় ঘোষণা করতে পারবেন।
বিশেষ প্রভাব
এই সংশোধনী আইনের ২(২) উপ-ধারা অনুযায়ী, এটি ৮ মে, ২০২৫ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল পদ্ধতির অন্তর্ভুক্তি এবং মামলার সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে লাঘব হবে এবং দেশের বিচার বিভাগে এক নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটবে।
সূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, ১০ এপ্রিল, ২০২৬।



