আউটসোর্সিং কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারের নতুন নির্দেশনা: যৌক্তিক কারণ ছাড়া ছাঁটাই নয়
সরকারি দফতরগুলোতে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় কর্মরত সেবাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ২০ নভেম্বর অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা-২০২৫ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে কোনো সেবাকর্মীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাজনিত কারণে ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের ‘আউটসোর্সিং সেবা পরিবীক্ষণ কমিটি’র মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ ইছমত উল্লাহ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
১. যৌক্তিক কারণ ছাড়া ছাঁটাই নিষেধ: কোনো প্রতিষ্ঠান যখন আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নতুন চুক্তি করবে বা পুরোনো চুক্তি নবায়ন করবে, তখন কর্মরত সেবাকর্মীদের যৌক্তিক কারণ ছাড়া বাদ দেওয়া যাবে না। যদি বিশেষ কোনো কারণে কাউকে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে অবশ্যই ‘আউটসোর্সিং সেবা পরিবীক্ষণ কমিটি’র (তফসিল-‘ক’ অনুযায়ী) পূর্ব অনুমোদন বা মতামত নিতে হবে।
২. অভিযোগ প্রতিকারে তদন্ত কমিটি: আউটসোর্সিং নীতিমালা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে সভাপতি করে ৩ সদস্যের এই কমিটি গঠিত হবে। কমিটিতে অর্থ বিভাগ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
নির্দেশনাটি বাস্তবায়নের জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে আউটসোর্সিং কর্মীদের চাকরির অনিশ্চয়তা কমবে এবং নিয়োগকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে আউটসোর্সিং কর্মীরা তাদের চাকরির নিরাপত্তা ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। এই নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হলো।

আউটসোর্সিং চাকরি কেমন চাকরি?
আউটসোর্সিং চাকরি বলতে সহজ কথায় বোঝায়, যখন কোনো প্রতিষ্ঠান (যেমন সরকারি অফিস বা ব্যাংক) সরাসরি নিজে কর্মী নিয়োগ না দিয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা আউটসোর্সিং ভেন্ডর (ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান)-এর মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে।
এই ধরণের চাকরির ধরণ এবং সুবিধা-অসুবিধাগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. চাকরির প্রকৃতি (Nature of Job)
এখানে আপনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন (যেমন: সচিবালয় বা বিদ্যুৎ অফিস), আপনি সরাসরি তাদের কর্মচারী নন। আপনার নিয়োগকর্তা হলো ওই ভেন্ডর কোম্পানি। সরকারি বা বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী, গাড়ি চালক, কম্পিউটার অপারেটর বা টেকনিক্যাল সাপোর্টের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।
২. বেতন ও সুযোগ-সুবিধা
-
বেতন: আপনার বেতন আসবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সরকারি নীতিমালায় সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মজুরি কাঠামো থাকে।
-
বোনাস ও ছুটি: সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী উৎসব ভাতা (বোনাস) পাওয়ার কথা থাকলেও, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা (যেমন: পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড) সাধারণত থাকে না।
৩. সুবিধাগুলো (Pros)
-
সহজ প্রবেশাধিকার: সরাসরি সরকারি চাকরির তুলনায় আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ ও দ্রুত হয়।
-
অভিজ্ঞতা: এই কাজের মাধ্যমে বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, যা ভবিষ্যতে অন্য ভালো চাকরির ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
-
নতুন সুরক্ষা নীতিমালা: সম্প্রতি সরকার (আপনার দেওয়া চিঠিতে যেমনটি দেখা গেছে) আউটসোর্সিং কর্মীদের সুরক্ষায় নতুন নিয়ম করেছে, যাতে চাইলেই কাউকে বিনা কারণে ছাঁটাই করা না যায়।
৪. অসুবিধা বা চ্যালেঞ্জ (Cons)
-
চাকরির স্থায়িত্ব: এটি কোনো স্থায়ী বা ক্যাডার সার্ভিস নয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে বা ঠিকাদারের সাথে চুক্তি শেষ হলে চাকরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
-
পদোন্নতির অভাব: আউটসোর্সিং চাকরিতে সাধারণত পদোন্নতি বা প্রমোশনের সুযোগ খুব একটা থাকে না।
-
ঠিকাদারের ভূমিকা: অনেক সময় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন থেকে কমিশন রাখা বা বেতন দিতে দেরি করার মতো অভিযোগ শোনা যায়।
উপসংহার
আউটসোর্সিং চাকরি বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব দূর করার একটি বড় মাধ্যম। আপনি যদি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কর্মসংস্থান খুঁজছেন এবং বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা নিতে চান, তবে এটি একটি ভালো সুযোগ। তবে দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার বা স্থায়ী সরকারি সুবিধার কথা চিন্তা করলে এটি মূল ধারার সরকারি চাকরির বিকল্প নয়।


