সার্ভিস রুলস । নীতি । পদ্ধতি । বিধি

সার্ভিস বুক লেখার নিয়ম ২০২৬ । সরকারি কর্মচারীর চাকরি বই কিভাবে লিখে?

সরকারি চাকরিতে যোগদান থেকে অবসর গ্রহণ পর্যন্ত একজন কর্মচারীর কর্মজীবনের দর্পণ হলো তার সার্ভিস বুক। পেনশন, পদোন্নতি, এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্টসহ সকল আর্থিক সুবিধা এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ বেতারের টেকনিশিয়ান জনাবা দিলারা সুলতানার সার্ভিস বুকের তথ্যাদি পর্যালোচনায় এর লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উঠে এসেছে।


১. ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রাথমিক পরিচিতি (পৃষ্ঠা-১)

সার্ভিস বুকের শুরুতেই কর্মচারীর স্থায়ী পরিচিতি এবং শনাক্তকরণ চিহ্নসমূহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করতে হয়:

  • নাম ও জাতীয়তা: কর্মচারীর পূর্ণ নাম এবং জাতীয়তা (যেমন: বাংলাদেশী জন্মসূত্রে) উল্লেখ থাকতে হবে।

  • শারীরিক চিহ্ন ও উচ্চতা: শনাক্তকরণের জন্য শারীরিক বিশেষ চিহ্ন (যেমন: বাম ঘাড়ে তিলক চিহ্ন) এবং সঠিক উচ্চতা উল্লেখ করা আবশ্যিক।

  • জন্ম তারিখ: ইংরেজি সনে জন্ম তারিখ অংকে ও কথায় স্পষ্টভাবে লিখতে হবে, যা পরবর্তীতে অবসরের তারিখ নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়।

  • আঙ্গুলের ছাপ: নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাম হাতের পাঁচটি আঙ্গুলের ছাপ দিতে হয়, যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নবায়ন বা পুনঃসত্যায়ন করতে হয়।

২. চাকুরীর বিবরণ ও পদোন্নতি (কলাম ২ ও ৩)

কর্মচারী কোন পদে নিয়োগ পেয়েছেন, পদটি স্থায়ী না অস্থায়ী এবং নিয়োগের তারিখ এখানে লিপিবদ্ধ হয়:

  • পদের নাম: যেমন ‘ইকুইপমেন্ট এটেনডেন্ট’ বা ‘ টেকনিশিয়ান’।

  • যোগদান ও অবমুক্তি: এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলি হলে বদলির আদেশ নম্বরসহ যোগদানের তারিখ এবং পূর্বের কর্মস্থল থেকে অবমুক্তির তারিখ নিখুঁতভাবে লিখতে হয়।

৩. বেতন নির্ধারণ ও টাইম স্কেল (কলাম ৬ ও ৭)

বেতন স্কেল এবং ইনক্রিমেন্ট সংক্রান্ত তথ্যসমূহ সার্ভিস বুকের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ:

  • বেতন স্কেল: সরকারি বেতন স্কেল (যেমন: ২০১৫ অনুযায়ী) এবং গ্রেড স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

  • উচ্চতর গ্রেড ও টাইম স্কেল: চাকরির ১০ বা ১৬ বছর পূর্তিতে প্রাপ্ত উচ্চতর গ্রেডের তথ্য এবং বেতন ফিক্সেশন (Fixation) সংশ্লিষ্ট হিসাব রক্ষণ অফিসের সত্যায়নসহ লিপিবদ্ধ করতে হয়।

  • বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট: প্রতি বছর জুলাই মাসে প্রাপ্য বার্ষিক বর্ধিত বেতন বা ইনক্রিমেন্টের তথ্য এখানে আপডেট করা হয়।

৪. ছুটির হিসাব ও শ্রান্তি বিনোদন (কলাম ১৩ ও ১৪)

ছুটি সংক্রান্ত সকল তথ্য সার্ভিস বুকের নির্ধারিত ফরমে (যেমন: এ.টি.সি-৮) সংরক্ষিত থাকে:

  • অর্জিত ছুটি: ১৯৫৫ সালের নির্ধারিত ছুটি বিধি অনুযায়ী গড় বা আধা গড় বেতনে ছুটির হিসাব রাখতে হয়।

  • শ্রান্তি বিনোদন ছুটি: প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাপ্ত ১৫ দিনের শ্রান্তি বিনোদন ছুটি এবং এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ভাতার তথ্য আদেশ নম্বরসহ লিখতে হয়।

৫. দাপ্তরিক সত্যায়ন ও নবায়ন

সার্ভিস বুকের প্রতিটি এন্ট্রি অবশ্যই অফিস প্রধান বা নির্ধারিত সত্যায়নকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও পদবীসহ সত্যায়িত হতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সার্ভিস বুকের সকল তথ্যাদি নবায়ন এবং পুনরায় যাচাই করা বাধ্যতামূলক।


উপসংহার: একজন সরকারি কর্মচারীর জন্য সার্ভিস বুক কেবল একটি খাতা নয়, বরং এটি তার ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার দলিল। তাই নিয়োগের শুরু থেকেই নিজ দায়িত্বে সার্ভিস বুকের এন্ট্রিগুলো যাচাই করা এবং সঠিক সময়ে হালনাগাদ নিশ্চিত করা উচিত।

চাকরিতে যোগদান ও অব্যাহতি কিভাবে এন্ট্রি করতে হয়?

সার্ভিস বুকে চাকুরিতে যোগদান (Joining) এবং অব্যাহতি (Release) সংক্রান্ত তথ্য এন্ট্রি করার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই একজন কর্মচারীর চাকুরিকাল বা সার্ভিস লেন্থ (Service Length) গণনা করা হয়। সংযুক্ত সার্ভিস বুকের তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে নিচে সঠিক নিয়ম তুলে ধরা হলো:

চাকুরিতে যোগদান ও অব্যাহতির এন্ট্রি নিয়মাবলী

সার্ভিস বুকে এই তথ্যগুলো সাধারণত কলাম ২, ৩, ১০ এবং ১১-তে লিপিবদ্ধ করা হয়।

১. নতুন চাকুরিতে বা পদোন্নতিতে যোগদান (Joining Entry)

যখন কোনো কর্মচারী নতুন চাকুরিতে যোগ দেন বা পদোন্নতি পেয়ে নতুন পদে আসেন, তখন নিচের তথ্যগুলো এন্ট্রি করতে হয়:

  • পদের নাম ও প্রকৃতি: কলাম ২-এ পদের নাম (যেমন: রেডিও টেকনিশিয়ান) এবং কলাম ৩-এ পদটি স্থায়ী না অস্থায়ী (যেমন: অফিশিয়েটিং বা অস্থায়ী) তা উল্লেখ করতে হবে।

  • যোগদানের তারিখ ও সময়: নিয়োগ বা পদোন্নতির আদেশ মোতাবেক যোগদানের তারিখ এবং সময় (পূর্বাহ্ণ বা অপরাহ্ণ) স্পষ্টভাবে লিখতে হবে।

  • আদেশ নম্বর ও সূত্র: যোগদানটি কোন অফিসের আদেশ বলে হয়েছে, সেই স্মারক নম্বর ও তারিখ বিবরণী কলামে উল্লেখ করতে হয়।

  • বেতন নির্ধারণ: যোগদানের সময় কর্মচারীর মূল বেতন কত নির্ধারিত হলো, তা সংশ্লিষ্ট কলামে লিখতে হবে।

২. বদলি বা অব্যাহতি এন্ট্রি (Release/Relieve Entry)

এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলি হলে বা চাকুরি থেকে অব্যাহতি নিলে নিচের নিয়ম অনুসরণ করতে হয়:

  • অব্যাহতির কারণ: কলাম ১০-এ অব্যাহতির কারণ (যেমন: বদলি বা পদোন্নতি) লিখতে হয়।

  • অব্যাহতির তারিখ: কত তারিখে এবং কোন সময়ে (পূর্বাহ্ণ/অপরাহ্ণ) কর্মচারীকে দায়িত্ব হতে অবমুক্ত করা হলো, তা কলাম ১১-তে লিখতে হবে।

  • বদলি আদেশের রেফারেন্স: কোন কার্যালয়ের কত নম্বর আদেশ অনুযায়ী বদলি করা হয়েছে, তা বিস্তারিত উল্লেখ করতে হয়।

  • সত্যায়ন: অব্যাহতির প্রতিটি এন্ট্রি অবশ্যই অফিস প্রধানের স্বাক্ষর ও পদবী দ্বারা সত্যায়িত হতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ (সার্ভিস বুক অনুযায়ী):

“বাংলাদেশ বেতার সদর দপ্তরের ২১-১০-২০২৪ তারিখের আদেশ মোতাবেক রেডিও ন জনাবা কে উচ্চ এ বদলি করা হয়। প্রেক্ষিতে তাকে ২৪-১০-২০২৪ তারিখ অপরাহ্ণে দপ্তরের কর্মদায়িত্ব হতে অবমুক্ত (অব্যাহতি) করা হলো এবং তিনি ২৯-১০-২০২৪ তারিখ পূর্বাহ্ণে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেন।”


মনে রাখবেন: যোগদানের সময় পূর্বাহ্ণে (Forenoon) এবং অব্যাহতির সময় সাধারণত অপরাহ্ণে (Afternoon) উল্লেখ করা হয় যাতে চাকুরির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

2 thoughts on “সার্ভিস বুক লেখার নিয়ম ২০২৬ । সরকারি কর্মচারীর চাকরি বই কিভাবে লিখে?

  • রফিকুল ইসলাম

    পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারীরা ২০০৯ ও ২০০৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী ‘পদোন্নতি না পাইলে বিবেচনায়’ নিম্নপদে টাইমস্কেলের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারনের সুবিধা পেতেন, ২০১৫ পে স্কেলে এ সুবিধা বহাল আছে কিনা দয়া করে জানালে উপকৃত হবো।

  • না। এ সুবিধা বহাল নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *