সর্বশেষ প্রকাশিত পোস্টসমূহ

৩০ বছরের পদোন্নতিহীন সেবা: নিয়োগ বিধি ও ১২তম গ্রেডের দাবিতে ফুঁসছেন ২৩,৫০০ পরিবার কল্যাণ সহকারী

দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ‘পরিবার কল্যাণ সহকারী’রা (FWA) দীর্ঘ তিন দশক ধরে চরম পেশাগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। একদিকে অর্জিত সাফল্য, অন্যদিকে নিয়োগ বিধির অনুপস্থিতি ও নিম্ন গ্রেডে বেতন প্রাপ্তি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এই সংকট নিরসনে এবং ‘নিয়োগ বিধি-২০২৪’ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবার কল্যাণ সহকারী সমিতি।

সাফল্যের কারিগর যখন নিজেই অবহেলিত

প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে যেখানে গড় প্রজনন হার (TFR) ছিল ৬.৭৩, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২.৩-এ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিশাল অর্জনের নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ২৩,৫০০ নারী পরিবার কল্যাণ সহকারী। যারা প্রতিকূল পরিবেশ ডিঙিয়ে ঘরে ঘরে পরিবার পরিকল্পনা সেবা, নিরাপদ প্রসব ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করে চলেছেন। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি তাদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়োগ বিধি প্রণয়ন করা হয়নি। ফলে একজন কর্মী যে পদে যোগদান করছেন, দীর্ঘ ৩০-৩৫ বছর সেবা দিয়ে সেই একই পদ থেকেই অবসরে যাচ্ছেন।

গ্রেড বৈষম্যের ‘অপমান’

আন্দোলনরত কর্মীদের অভিযোগ, তাদের চাকরি তৃতীয় শ্রেণির হলেও ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোতে তাদের ১৭তম গ্রেডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কাজের পরিধি সম্পন্ন অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মীরা উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন, সেখানে মাঠ পর্যায়ের এই নারী কর্মীদের নিম্ন গ্রেডে রাখা চরম অপমানজনক। তাদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার মান ও কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় তাদের ন্যূনতম ১২তম গ্রেড প্রদান করা হোক।

একীভূত স্বাস্থ্যসেবা ও নতুন চ্যালেঞ্জ

সরকার বর্তমানে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে FWA, HA (হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট) এবং CHCP (কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) দের সমন্বিত করার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু এই তিন ক্যাডারের বেতন কাঠামো ও শিক্ষাগত যোগ্যতা ভিন্ন হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়হীনতার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মুক্তা পারভীন জানান,

“আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সাথে কাজ করছি। কিন্তু যখন দেখি ৩০ বছরেও আমাদের কোনো পদোন্নতি নেই এবং আমাদের বেতন বৈষম্য আকাশচুম্বী, তখন সেবা দিতে গিয়ে আমাদের মধ্যে চরম হতাশা কাজ করে।”

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা

বর্তমানে নিয়োগ বিধির ফাইলটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পরিবার কল্যাণ সহকারীরা আশা করছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার মানবিক ও দক্ষ নেতৃত্বে এই দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্য দূর করবেন। তাদের মূল দাবিগুলো হলো: ১. নিয়োগ বিধি-২০২৪ দ্রুত বাস্তবায়ন। ২. বেতন কাঠামো ১৭তম গ্রেড থেকে ১২তম গ্রেডে উন্নীত করা। ৩. শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি সাপেক্ষে পদোন্নতির সোপান তৈরি করা।

উপসংহার

দেশের মা ও শিশু মৃত্যু রোধ এবং টিসিভি (TCV), এইচপিভি (HPV) সহ সকল জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি সফল করার নেপথ্যে থাকা এই বৃহৎ নারী জনবলকে অবহেলার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে আগে সেবাদানকারীদের কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদার উন্নয়ন জরুরি।

নিয়োগ বিধি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ২৩,৫০০ কর্মীর দীর্ঘ ৩০ বছরের বঞ্চনার অবসান ঘটবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।

admin

আমি একজন সরকারী চাকরিজীবি। দীর্ঘ ১০ বছর যাবৎ চাকুরির সুবাদে সরকারি চাকরি বিধি বিধান নিয়ে পড়াশুনা করছি। বিএসআর ব্লগে সরকারি আদেশ, গেজেট, প্রজ্ঞাপন ও পরিপত্র পোস্ট করা হয়। এ ব্লগের কোন পোস্ট নিয়ে প্রশ্ন থাকলে বা ব্যাখ্যা জানতে পোস্টের নিচে কমেন্ট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *