উন্নয়ন প্রকল্পে আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণে বড় স্পষ্টীকরণ: কখন লাগবে না অর্থ বিভাগের অনুমোদন
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে যে ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছিল, তা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্টীকরণ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
প্রাপ্ত সরকারি পত্র অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ, নতুন সেবা অন্তর্ভুক্তি এবং বিদ্যমান সেবার মেয়াদ নবায়নের ক্ষেত্রে কোন কোন পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে না—সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের ওয়েবসাইটে ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ ১৬ এপ্রিল ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে নীতিমালাটির বিভিন্ন দিক নিয়ে পৃথক স্পষ্টীকরণও জারি করা হয়েছে।
পুরোনো অনুমোদনের আওতায় চলমান সেবায় নতুন করে অনুমোদন নয়
স্পষ্টীকরণে বলা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পূর্ববর্তী নির্দেশনা ও প্রজ্ঞাপনের আওতায় যেসব আউটসোর্সিং সেবা ইতোমধ্যে অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সেসব সেবার নবায়নের ক্ষেত্রে নতুন করে অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে না।
অর্থাৎ, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে আগে থেকেই অনুমোদিত আউটসোর্সিং জনবল বা সেবা চালু থাকলে শুধুমাত্র নবায়নের জন্য আবার দীর্ঘ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যেতে হবে না—এমনটাই নির্দেশনার মূল তাৎপর্য।
এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
নতুন আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণ এবং নীতিমালায় নির্ধারিত কিছু সেবার নবায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের আলাদা অনুমোদনের প্রয়োজন নেই বলে স্পষ্টীকরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় বা যেকোনো মেয়াদের জন্য সীমাহীনভাবে আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণ করতে পারবে।
নির্দেশনায় পরিষ্কার করা হয়েছে, আউটসোর্সিং সেবার চুক্তির মেয়াদ অবশ্যই প্রকল্পের মূল বা অনুমোদিত বর্ধিত মেয়াদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ, প্রকল্পের মেয়াদের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সেবা চুক্তি করার সুযোগ থাকবে না।
প্রকল্পের সময়সীমাই হবে মূল বিবেচ্য
স্পষ্টীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—আউটসোর্সিং সেবার চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণে প্রকল্পের অনুমোদিত সময়সীমাকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
প্রকল্পের মূল মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে এবং প্রকল্পের মেয়াদ বৈধভাবে বাড়ানো হলে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বর্ধিত সময়ের জন্য সেবা অব্যাহত রাখা যাবে।
এ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ, বাস্তব প্রয়োজন এবং প্রচলিত সরকারি বিধিবিধান বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নবায়নের ক্ষেত্রে কী হবে?
নীতিমালার আওতায় আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে নেওয়া সেবার চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
পত্রে মূলত এই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, প্রতিটি নবায়নের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
বরং সেবার ধরন, পূর্ববর্তী অনুমোদনের ভিত্তি, প্রকল্পের মেয়াদ এবং নীতিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
কেন এ স্পষ্টীকরণ গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, কারিগরি সহায়তা, অফিস সহায়ক কার্যক্রম, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ডাটা এন্ট্রি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়।
নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার পর একটি বড় প্রশ্ন ছিল—আগে থেকে চলমান আউটসোর্সিং সেবার চুক্তি নবায়ন করতে গেলেও কি অর্থ বিভাগের অনুমোদন লাগবে?
আবার নতুন করে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগের অনুমোদন কাঠামো নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
নতুন স্পষ্টীকরণের ফলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ আরও পরিষ্কার হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কমতে পারে প্রশাসনিক জটিলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রতিটি ছোটখাটো সেবা নবায়নের জন্য একাধিক দপ্তরে অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হলে প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে প্রকল্পে কর্মরত আউটসোর্সিং জনবলের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে প্রকল্পের প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
অর্থ বিভাগের এই ব্যাখ্যা সেই জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তবে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা কমলেও আর্থিক শৃঙ্খলা, সরকারি ক্রয়বিধি, প্রকল্প অনুমোদনের শর্ত এবং আউটসোর্সিং নীতিমালার অন্যান্য বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জন্য করণীয়
নতুন নির্দেশনার আলোকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—
- চলমান সেবাটি পূর্ববর্তী বৈধ অনুমোদনের আওতায় রয়েছে কি না;
- সেবাটি নতুন নাকি বিদ্যমান চুক্তির নবায়ন;
- সেবার চুক্তির মেয়াদ প্রকল্পের মূল বা অনুমোদিত বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে রয়েছে কি না;
- নীতিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না;
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রকল্পের অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না।
নীতিমালার বাস্তবায়নে আরও স্পষ্টতা
অর্থ বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আউটসোর্সিং নীতিমালা প্রণয়নের পর এর ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত একাধিক নির্দেশনা জারি হয়েছে। ফলে প্রকল্প ও সরকারি দপ্তরগুলোকে সর্বশেষ প্রযোজ্য নির্দেশনা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
উন্নয়ন প্রকল্পে আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন এই স্পষ্টীকরণের মূল বার্তা হলো—সব ধরনের নতুন বা নবায়নকৃত সেবার জন্য একইভাবে অর্থ বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হবে না। তবে প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ, নীতিমালার বিধান এবং প্রযোজ্য সরকারি নিয়ম মেনে সেবা গ্রহণ ও নবায়ন করতে হবে।
এর ফলে একদিকে যেমন প্রকল্প বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বিলম্ব কমার সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে প্রকল্পের মেয়াদের বাইরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি আউটসোর্সিং চুক্তি করার সুযোগও সীমিত থাকবে।
সংক্ষেপে বলা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পে আউটসোর্সিং ব্যবস্থাকে সহজ করার পাশাপাশি আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বজায় রাখতেই অর্থ বিভাগ বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছে।


